
বিদেশে চাকরি নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন যাঁদের, তাঁদের জন্য পাসপোর্টের পরেই সবচেয়ে জরুরি ধাপ হলো বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন (BMET registration)। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কাজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যেতে হলে বিএমইটি ডাটাবেজে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, এটি ছাড়া বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হওয়া যায় না। এই কার্ডকে অনেকে ‘জনশক্তি কার্ড’, ‘ম্যানপাওয়ার কার্ড’ বা ‘স্মার্ট কার্ড’ নামেও চেনেন।
এই গাইডে ধাপে ধাপে দেখানো হলো, বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, BMET registration check করার পদ্ধতি, এবং বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোড করার উপায়। সবচেয়ে জরুরি একটি আপডেটও আছে, যেটি অনেক পুরোনো গাইডে নেই, তাই শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
রেজিস্ট্রেশনের আগে যা যা প্রস্তুত রাখবেন
আবেদন শুরু করার আগে নিচের জিনিসগুলো স্ক্যান বা পরিষ্কার ছবি তুলে ফোনে রেডি রাখুন। প্রস্তুতি থাকলে পুরো কাজ ১০ মিনিটেই শেষ হয়।
প্রথমত, নিজের সচল পাসপোর্ট, এটাই মূল ডকুমেন্ট। পাসপোর্ট না থাকলে বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, পাসপোর্ট সাইজের সদ্য তোলা ছবি। তৃতীয়ত, নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও তথ্য। চতুর্থত, ফি পরিশোধের জন্য একটি বিকাশ বা নগদ একাউন্ট। পাসপোর্ট না থাকলে বিএমইটি করা যাবে না; অনলাইনে আবেদনের আগে সচল পাসপোর্ট, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, নমিনির NID এবং বিকাশ/নগদ একাউন্ট রেডি রাখতে হবে।
পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম ও ফি – Mrp পাসপোর্ট নবায়ন করার নিয়ম
বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম (অনলাইন, ধাপে ধাপে)

BMET registration online করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো Ami Probashi অ্যাপ। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
প্রথমে Google Play Store বা Apple App Store থেকে Ami Probashi অ্যাপটি ইনস্টল করুন। অ্যাপ খুলে শুরুর নির্দেশনাগুলোতে ‘Next’ চাপুন। এরপর আপনার মোবাইল নাম্বার দিয়ে রেজিস্টার করুন এবং OTP দিয়ে ভেরিফাই করুন। অ্যাকাউন্ট তৈরি হলে ‘BMET Registration’ অপশনে যান। এখানে আপনার পাসপোর্টের স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে, তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হবে, তবে ভালো করে মিলিয়ে নিন। এরপর ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা, কোন দেশে যেতে চান, কী কাজ করবেন এবং নমিনির তথ্য পূরণ করুন। সব ঠিক থাকলে বিকাশ বা নগদ দিয়ে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন। আবেদন সফল হলে আপনি একটি BMET Identification Number (BIDN) সহ নিশ্চিতকরণ পাবেন। নিবন্ধন সফল হলে ব্যবহারকারী একটি BMET registration card পাবেন, যাতে একটি BMET Identification Number (BIDN) ও প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে।
যাঁরা অনলাইনে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁদের জন্য বিকল্প আছে, নিজ জেলার কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস অথবা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (TTC) সরাসরি গিয়েও নিবন্ধন করা যায়।
পাসপোর্ট করার নিয়ম ও খরচ : পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে
বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন ফি কত
সরকারি নিবন্ধন ফি তুলনামূলক কম এবং নির্দিষ্ট। প্রতিটি সফল নিবন্ধনের জন্য ২০০ টাকা সরকারি ফি দিতে হয়, যা অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ একবার পরিশোধ করলে এই টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না, তাই তথ্য পূরণে সতর্ক থাকুন। মনে রাখবেন, সরকারি ফি ও এজেন্সি/দালালের চাওয়া অতিরিক্ত টাকা এক জিনিস নয়, সরকারি ফি কেবল ২০০ টাকা।
প্রশিক্ষণ (PDO) ও স্মার্ট কার্ড
বিএমইটি নিবন্ধনের পর বিদেশগামী কর্মীদের একটি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হয়, যাকে PDO (Pre-Departure Orientation) বলা হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (TTC) তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষে সরকার এই কার্ড দেয়, যা বিদেশ যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশন পয়েন্টে লাগে। প্রশিক্ষণে শেখানো হয় বিদেশে কীভাবে চলতে হবে, কাজ করতে হবে এবং আর্থিক বিষয়াদি কীভাবে সামলাতে হবে। প্রশিক্ষণের দিন-তারিখের নোটিফিকেশন Ami Probashi অ্যাপেই পাবেন।
BMET registration check ও বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোড করার নিয়ম
আপনার আবেদন অনুমোদন হলো কিনা তা যাচাই (BMET registration check) এবং বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোড, দুটোই শুধু পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে করা যায়। সাধারণত প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার ২–৩ কর্মদিবসের মধ্যে স্মার্ট কার্ড অনলাইনে পাওয়া যায়।
ডাউনলোডের ধাপ: প্রথমে Ami Probashi কার্ড ডাউনলোড পেজে যান অথবা অ্যাপ খুলুন। BMET Smart Card সেকশনে প্রথম বক্সে আপনার নিবন্ধনে ব্যবহৃত পাসপোর্ট নাম্বার লিখুন। নিচের ক্যাপচা বক্সে দেখানো অক্ষর/সংখ্যাগুলো সঠিকভাবে বসান। এরপর ‘Search’ বাটনে ক্লিক করুন। পাসপোর্ট নাম্বার ও ক্যাপচা দিয়ে সার্চ করলে পেজ রিলোড হয়ে নিচে BMET Smart Card দেখাবে, যাতে ক্লিয়ারেন্স আইডি, নাম, পাসপোর্ট নাম্বার, ভিসা নাম্বার এবং কোন দেশে কী কাজে যাচ্ছেন তা থাকে। কার্ডটি এলে সেটি প্রিন্ট বা সেভ করে রাখুন। QR কোড-ভিত্তিক এই বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ফ্রি, পাসপোর্ট নাম্বার ও ক্যাপচা দিয়ে সার্চ করে ডাউনলোড করা যায়।
লক্ষণীয়, রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও ক্লিয়ারেন্স কার্ড আলাদা ডকুমেন্ট। Ami Probashi পোর্টালে BMET registration card ও clearance card ডাউনলোডের আলাদা পেজ আছে; কার্ড না পেলে আগে নিশ্চিত করুন কোন ডকুমেন্ট খুঁজছেন।
BMET কার্ড ও সার্টিফিকেট: কোনটি কী

অনেকেই BMET Card, স্মার্ট কার্ড, ম্যানপাওয়ার কার্ড, ক্লিয়ারেন্স কার্ড ও BMET সার্টিফিকেট, এই শব্দগুলো একই অর্থে ব্যবহার করেন, কিন্তু এগুলো অভিবাসন প্রক্রিয়ার ভিন্ন ধাপের ভিন্ন কাগজ। নিচের টেবিলে পার্থক্য সহজ করে দেওয়া হলো:
| ডকুমেন্ট | কখন পাওয়া যায় | কাজ |
|---|---|---|
| BMET রেজিস্ট্রেশন কার্ড | নিবন্ধন সফল হলে | ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ, BIDN নাম্বার থাকে |
| BMET সার্টিফিকেট (PDO) | তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষে | প্রশিক্ষণ সম্পন্নের প্রমাণ |
| ক্লিয়ারেন্স/স্মার্ট কার্ড | ভিসা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর | ইমিগ্রেশন পার হতে লাগে, QR কোড থাকে |
সাধারণ ভুল ও বাস্তব টিপস
দীর্ঘদিন এই বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বাস্তব পরামর্শ। পাসপোর্ট নাম্বার হুবহু নিবন্ধনের সময়কারটির মতো বসান, একটি অক্ষর ভুল হলেই কার্ড খুঁজে পাবেন না। কার্ড না পাওয়ার সাধারণ কারণ হলো ভুল পাসপোর্ট নাম্বার, রেজিস্ট্রেশন কার্ডের বদলে ক্লিয়ারেন্স কার্ড খোঁজা, পোর্টাল রক্ষণাবেক্ষণে থাকা, অথবা ভুল ক্যাপচা। ক্যাপচা ভুল হলে পেজ রিফ্রেশ করে নতুন ক্যাপচা দিন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দালালের হাতে সব ছেড়ে না দিয়ে নিজের তথ্য নিজে যাচাই করুন, কারণ সরকারি ফি মাত্র ২০০ টাকা এবং সরকারি ক্লিয়ারেন্স সেবা ফ্রি।
সহজ ভাষায়: প্রাথমিক বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন ও কার্ড ডাউনলোড Ami Probashi দিয়ে, আর বিদেশ যাওয়ার চূড়ান্ত ক্লিয়ারেন্স সরকারি পোর্টাল bmet gov bd দিয়ে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কীভাবে করব?
Ami Probashi অ্যাপ ডাউনলোড করে মোবাইল নাম্বার দিয়ে রেজিস্টার করুন, পাসপোর্ট স্ক্যান আপলোড করে তথ্য পূরণ করুন এবং বিকাশ/নগদ দিয়ে ২০০ টাকা ফি পরিশোধ করুন। অফিসে গিয়েও সরাসরি নিবন্ধন করা যায়।
বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন ফি কত?
সরকারি নিবন্ধন ফি ২০০ টাকা, যা অফেরতযোগ্য। সরকারি ক্লিয়ারেন্স সেবা ফ্রি।
বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড কীভাবে ডাউনলোড করব?
Ami Probashi কার্ড ডাউনলোড পেজ বা অ্যাপে গিয়ে পাসপোর্ট নাম্বার ও ক্যাপচা দিয়ে সার্চ করলে কার্ড দেখাবে; সেটি প্রিন্ট বা সেভ করা যায়।
BMET registration check কীভাবে করব?
শুধু পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে Ami Probashi পোর্টাল বা অ্যাপে সার্চ করে নিবন্ধনের অবস্থা ও কার্ড যাচাই করা যায়।
বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কি বিদেশ যাওয়া যায়?
না। কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যেতে হলে বিএমইটি ডাটাবেজে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক; এটি ছাড়া ইমিগ্রেশন পার হওয়া যায় না।
পাসপোর্ট ছাড়া কি বিএমইটি করা যায়?
না। সচল পাসপোর্ট ছাড়া বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন সম্ভব নয়।



