
জ্বর হলেই অনেকে প্রথম দিনেই ছুটে গিয়ে ডেঙ্গু টেস্ট করান, আবার অনেকে তিন-চার দিন অপেক্ষা করে ফেলেন। দুটোই ভুল হতে পারে। ডেঙ্গু টেস্টের একটা সঠিক সময় আছে, আর রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সেটা বোঝাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভুল সময়ে টেস্ট করালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসতে পারে, অথচ শরীরে ভাইরাস ঠিকই থাকে। এই লেখায় ঠিক কোন দিন কোন টেস্ট করাবেন, আর রিপোর্টে কী দেখলে কী বুঝবেন, সেটা বিস্তারিত বলছি।
শুরুতেই বলে রাখি, এই লেখা আপনাকে সঠিক প্রশ্ন করতে সাহায্য করবে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় আপনার চিকিৎসকই নেবেন।
শিশুদের ডেঙ্গু: লক্ষণ, সতর্কতা ও ঘরে করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘর পরিষ্কার ও মশা নিয়ন্ত্রণের বাস্তব টিপস
ডেঙ্গু জ্বর লক্ষণ, চিকিৎসা, প্রতিকার, প্রতিরোধ, ও করণীয়
জ্বরের প্রথম দিন থেকেই কি টেস্ট করানো উচিত
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, একদম প্রথম দিনে টেস্ট করালে ফলাফল সবসময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর একটা নির্দিষ্ট সময় লাগে যাতে রক্তে পরীক্ষাযোগ্য পরিমাণে ভাইরাসের চিহ্ন বা এন্টিবডি তৈরি হয়। এই সময়টা না মেনে টেস্ট করালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসতে পারে, অথচ বাস্তবে রোগী ডেঙ্গুতেই আক্রান্ত। তাই কখন করাবেন, সেটা জানা যতটা জরুরি, ঠিক ততটাই জরুরি কোন টেস্ট করাবেন সেটা জানা।
জ্বরের দিন অনুযায়ী কোন টেস্ট কখন করাবেন
ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য মূলত তিন ধরনের টেস্ট আছে, আর প্রতিটার কার্যকারিতা নির্ভর করে জ্বর কতদিন ধরে চলছে তার ওপর।
জ্বরের প্রথম দিন থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত, এনএস১ এন্টিজেন টেস্ট সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। এই সময়ে রক্তে ভাইরাসের একটা নির্দিষ্ট প্রোটিন সরাসরি ধরা পড়ে, তাই জ্বর শুরু হওয়ার পরপরই, বিশেষ করে প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে এই টেস্ট করানো সবচেয়ে ভালো ফল দেয়।
জ্বরের পঞ্চম দিনের পর থেকে আইজিএম এন্টিবডি টেস্ট বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এই সময়ের মধ্যে শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করে, প্রায় আশি শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে জ্বরের পঞ্চম দিনের মধ্যেই আইজিএম এন্টিবডি সনাক্ত করা যায়। তাই যদি জ্বর শুরুর পাঁচ-ছয় দিন পার হয়ে যায় আর তখনই প্রথম টেস্ট করান, তাহলে এনএস১ এর বদলে আইজিএম টেস্টই বেশি নির্ভরযোগ্য হবে।
আইজিজি টেস্ট একটু ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। এটা মূলত বোঝায় আপনার শরীরে অতীতে কখনো ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়েছিল কি না, তাই এটা বর্তমান সংক্রমণ নিশ্চিত করার চেয়ে অতীত ইতিহাস বোঝার জন্য বেশি ব্যবহার হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা এনএস১, আইজিএম, আর আইজিজি, তিনটে টেস্ট একসঙ্গে করাতে বলেন, কারণ নিশ্চিত ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে অনেকেরই এনএস১ ও আইজিএম দুটোই পজিটিভ আসে।
১৫ দিনে স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানোর উপায়: ডায়েট চার্ট
| জ্বরের দিন | কোন টেস্ট করাবেন | কেন |
|---|---|---|
| দিন ১ থেকে ৫ | এনএস১ এন্টিজেন | এই সময়ে ভাইরাসের প্রোটিন সরাসরি ধরা পড়ে |
| দিন ৫ এর পরে | আইজিএম এন্টিবডি | শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এতদিনে সক্রিয় হয়ে যায় |
| যেকোনো সময়, ইতিহাস বোঝার জন্য | আইজিজি এন্টিবডি | অতীতে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না বোঝায় |
| নিয়মিত মনিটরিং | সিবিসি বা কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট | প্লেটলেট ও হেমাটোক্রিটের প্রবণতা বোঝায় |
প্রথম টেস্ট নেগেটিভ এলে কী করবেন
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি হয়। ধরুন, জ্বরের প্রথম দিনে এনএস১ টেস্ট করালেন, রিপোর্ট নেগেটিভ এলো। এর মানে এই না যে আপনার ডেঙ্গু নেই। ভাইরাসের পরিমাণ তখনও পরীক্ষাযোগ্য মাত্রায় না পৌঁছালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসতে পারে, বিশেষ করে যদি টেস্টটা জ্বরের একদম প্রথম দিনেই করানো হয়।
লক্ষণ যদি স্পষ্ট ডেঙ্গুর মতো থাকে, তীব্র জ্বর, হাড়ে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, কিন্তু প্রথম টেস্ট নেগেটিভ আসে, তাহলে চিকিৎসক সাধারণত কয়েকদিন পর আবার টেস্ট করাতে বলেন, বিশেষ করে আইজিএম টেস্ট, যেহেতু ততদিনে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে গেছে। শুধু একটা নেগেটিভ রিপোর্ট দেখে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া ঠিক না, বিশেষ করে যদি লক্ষণ তীব্র থাকে।
রিপোর্ট হাতে পেলে কীভাবে বুঝবেন
এনএস১, আইজিএম, বা আইজিজি রিপোর্টে সাধারণত পজিটিভ বা নেগেটিভ লেখা থাকে। এনএস১ পজিটিভ মানে সক্রিয় সংক্রমণ চলছে, আইজিএম পজিটিভ মানেও সাম্প্রতিক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। শুধু আইজিজি পজিটিভ আর আইজিএম নেগেটিভ হলে সেটা সাধারণত পুরনো সংক্রমণের ইতিহাস বোঝায়, বর্তমান সংক্রমণ না।
সিবিসি রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হয় প্লেটলেট কাউন্ট আর হেমাটোক্রিটের ওপর। প্লেটলেট স্বাভাবিক মাত্রা দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখের মধ্যে থাকে। এই সংখ্যা কমতে থাকলে সেটা একটা প্রবণতা হিসেবে দেখা উচিত, একবারের রিপোর্টে আতঙ্কিত না হয়ে বরং কয়েকদিনের রিপোর্ট পাশাপাশি রেখে দেখুন সংখ্যাটা কীভাবে বদলাচ্ছে। হেমাটোক্রিট বা পিসিভি বেড়ে যাওয়া মানে রক্তে তরলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা শরীরের পানিশূন্যতার একটা গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সাদা রক্তকণিকার সংখ্যাও রিপোর্টে থাকে, আর ডেঙ্গুতে এটা প্রায়ই কমে যায়। এই তিনটে মান, প্লেটলেট, হেমাটোক্রিট, আর সাদা রক্তকণিকা, একসঙ্গে দেখেই চিকিৎসক বোঝেন রোগী কোন ধাপে আছেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত।
কতবার টেস্ট করানো উচিত
জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে একবার এনএস১ বা আইজিএম টেস্ট করালেই সাধারণত যথেষ্ট। কিন্তু জ্বর নিশ্চিত হয়ে গেলে, বিশেষ করে ষষ্ঠ দিন থেকে যখন ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হয়, তখন সিবিসি টেস্ট প্রতিদিন বা কখনো কখনো দিনে দুইবারও করাতে বলতে পারেন চিকিৎসক, যাতে প্লেটলেট আর হেমাটোক্রিটের পরিবর্তন দ্রুত ধরা যায়। এই সময়ে বারবার টেস্ট করানো বিরক্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু এটা মূলত সতর্কতার অংশ, বাড়তি খরচের জন্য না।
একটা বাস্তব উদাহরণ
ধরুন, সোমবার সকালে জ্বর শুরু হলো, তীব্র মাথাব্যথা আর শরীর ব্যথা সহ। মঙ্গলবার, অর্থাৎ জ্বরের দ্বিতীয় দিনে এনএস১ টেস্ট করালেন, রিপোর্ট পজিটিভ এলো। এখানে সময়টা সঠিক ছিল, তাই রিপোর্টও নির্ভরযোগ্য।
এবার উল্টো ধরুন, সোমবার জ্বর শুরু হলো, কিন্তু টেস্ট করালেন সেই দিনই বিকেলে, জ্বর শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। রিপোর্ট নেগেটিভ এলো। কিন্তু বুধবার দুপুরে জ্বর আর ব্যথা আরও বেড়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসক হয়তো আবার টেস্ট করাতে বলবেন, কারণ প্রথম টেস্টটা এত তাড়াতাড়ি করানো হয়েছিল যে ভাইরাসের পরিমাণ তখনও পর্যাপ্ত ছিল না।
কখন শুধু টেস্টের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি হাসপাতালে যাবেন
কিছু পরিস্থিতিতে টেস্ট রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই। পেটে তীব্র ব্যথা, লাগাতার বমি, মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত, ত্বকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাগ, প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যাওয়া, বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে টেস্ট রিপোর্ট হাতে না থাকলেও দেরি না করে হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। এই ধরনের লক্ষণে চিকিৎসা শুরু করাটা রিপোর্টের চেয়েও জরুরি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
জ্বরের প্রথম দিনেই কি ডেঙ্গু টেস্ট করানো উচিত?
লক্ষণ তীব্র হলে করানো যায়, তবে জ্বরের দ্বিতীয় দিন থেকে এনএস১ টেস্ট বেশি নির্ভরযোগ্য ফল দেয়। একদম প্রথম কয়েক ঘণ্টায় করালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
এনএস১ নেগেটিভ মানে কি নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু নেই?
না। লক্ষণ স্পষ্ট ডেঙ্গুর মতো হলে এবং প্রথম টেস্ট নেগেটিভ এলে কয়েকদিন পর আইজিএম টেস্ট করানো উচিত, কারণ এনএস১ এর কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে কমে যায়।
সিবিসি টেস্ট কতদিন পরপর করাতে হয়?
জ্বরের শুরুর দিকে নিয়মিত করানোর দরকার নেই, তবে ষষ্ঠ দিন থেকে ক্রিটিক্যাল ফেজে চিকিৎসক প্রতিদিন বা দিনে দুইবারও করাতে বলতে পারেন।
আইজিজি পজিটিভ আর আইজিএম নেগেটিভ হলে তার মানে কী?
এটা সাধারণত বোঝায় আপনার অতীতে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সক্রিয় সংক্রমণ নেই। তবে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা চিকিৎসকের কাছ থেকেই নেওয়া ভালো।
প্লেটলেট রিপোর্টে একদিনের সংখ্যা দেখেই কি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত?
না, একদিনের সংখ্যার চেয়ে কয়েকদিনের প্রবণতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্লেটলেট দ্রুত কমছে নাকি ধীরে কমছে, এই পার্থক্যটাই বেশি বলে দেয় পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।
সহায়ক লিংক
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু কর্নার, সরকারি নির্দেশনার জন্য: https://old.dghs.gov.bd/index.php/bd/
স্বাস্থ্য বাতায়ন হেল্পলাইন, বিনামূল্যে পরামর্শের জন্য, নম্বর ১৬২৬৩
সঠিক সময়ে সঠিক টেস্ট করানো, আর রিপোর্টটা সঠিকভাবে বোঝা, এই দুটোই ডেঙ্গু নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক কমিয়ে দেয়। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর নিজে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে বসেই পুরো ছবিটা বুঝে নিন।
এই লেখা একটা সংবেদনশীল স্বাস্থ্য বিষয়ে সাধারণ তথ্য দেওয়ার জন্য। বর্তমানে অসুস্থ থাকলে বা কোনো বিপদজনক লক্ষণ দেখা দিলে দয়া করে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।


