
বর্ষা শুরু হলেই যে রোগটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়ায়, সেটা ডেঙ্গু। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই জ্বরে আক্রান্ত হন, আর অনেকেই বুঝতে পারেন না ঠিক কখন সাধারণ জ্বর থেকে ডেঙ্গু আলাদা করবেন, কী খাবেন, কোন লক্ষণে হাসপাতালে ছুটবেন। এই লেখায় ডেঙ্গুর পুরো চিত্রটা তুলে ধরছি, লক্ষণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা, ঘরোয়া প্রতিকার, প্রতিরোধ, আর জরুরি মুহূর্তে ঠিক কী করণীয়, সবকিছু একসাথে।
শুরুতেই বলে রাখি, এই লেখা তথ্যের জন্য, চিকিৎসার বিকল্প না। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটাই সবসময় প্রথম কাজ হওয়া উচিত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘর পরিষ্কার ও মশা নিয়ন্ত্রণের বাস্তব টিপস
শিশুদের ডেঙ্গু: লক্ষণ, সতর্কতা ও ঘরে করণীয়
ডেঙ্গু প্লেটলেট কত হলে ভয়ংকর?
জ্বর হলে কখন ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে? (সময় ও রিপোর্ট বোঝা)
চিকুনগুনিয়া: লক্ষণ ও চিকিৎসা (ডেঙ্গুর সাথে পার্থক্য)
ডেঙ্গু কি এবং প্রতিরোধে কি করবেন?
এটি একটি মশাবাহিত রোগ। এডিস মশা থেকে এই রোগের উৎপত্তি। সাধারণত মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতে এরা লার্ভা অবস্থায় বেঁচে থাকে যা বর্ষার শুরুতেই নতুন করে বিস্তার লাভ করে। গ্রামের তুলনায় সাধারণত শহরে অভিজাত এলাকায় এই মশার প্রাদুর্ভাব বেশি।
এই জ্বর থেকে বাঁচার জন্য সাধারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যতটুকু সম্ভব গ্রহণ করুন। ঘুমানোর সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমান। বিকাল-সন্ধ্যার দিকেই ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে দিন। মশানিরোধক এরোসল স্প্রে করুন ঘরের আনাচে কানাচে। ফুলের টব, কৌটা ইত্যাদি জায়গায় পানি জমে থাকলে সেগুলো পরিস্কার করুন।
ডেঙ্গু কীভাবে ছড়ায়
ডেঙ্গু একটা ভাইরাসজনিত রোগ, যা ছড়ায় এডিস মশার কামড়ে। এই মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়, বিশেষ করে সূর্য ওঠার পরপর আর সূর্য ডোবার আগে। এডিস মশা জমা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, তাই ফুলের টব, ছাদের কোণে জমা পানি, ভাঙা টায়ার, বা এসির বাইরের অংশে জমে থাকা পানি এদের প্রজননের প্রধান জায়গা।
একজন মানুষ থেকে সরাসরি আরেকজনে ডেঙ্গু ছড়ায় না। মশা একজন আক্রান্ত মানুষকে কামড়ে ভাইরাস বহন করে, তারপর অন্য কাউকে কামড়ালে সেই ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। এই কারণেই একটা এলাকায় ডেঙ্গু রোগী বাড়লে আশেপাশের পুরো এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ
এখনকার ডেঙ্গু জ্বরের যেই লক্ষণ নিয়ে এসেছে তার সাথে পুর্বের ডেঙ্গু জ্বরের কোন মিল নেই। এবারের ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুর হারও বেশি এবাং প্রায় মহামারির দিকে ছুটে চলেছে। ধারনা করা হচ্ছে নতুন কোন শক্তিশালী স্ট্রেইনের ডেঙ্গু ভাইরাস এই জ্বরের জন্য দায়ী। হাসপাতালগুলোতেও প্রতিদিন নতুন রোগী এই জ্বর নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। এখনকার ডেঙ্গু জ্বর খুব দ্রুত হার্ট, কিডনি, ব্রেইনকে আক্রান্ত করছে। প্লাজমা (রক্তের তরল অংশ) লিকেজ হয়ে রোগী দ্রুত শকে চলে যেতে পারে যা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর রুপ নিচ্ছে। এ বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত ৪২৪৭জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে জুন থেকে ১২ই জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৩৬৪৭ জন।
ডেঙ্গু জ্বরে প্রাথমিক ভাবে কি করবেন ?
তীব্র জ্বর/ গা ব্যথা, চোখের পেছনদিকে ব্যথা, শরীরে চুলকানি বা র্যাশ, বমি, পেটে ব্যথা ইত্যাদি ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ। ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। ব্যথার জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনরকম এন্টিবায়োটিক অথবা ব্যাথার ওষুধ সেবন করা যাবে না। এই রোগের একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে শরীরের পানির পরিমান ব্যালেন্স রাখা। প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে জ্বর হলে। ডেঙ্গু জ্বরে পাতলা পায়খানা হলে তা জটিলতা অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয় তাই অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। স্বাভাবিক মাত্রায় প্রস্রাব হচ্ছে কিনা আর ব্লাড প্রেশার ঠিক আছে কিনা তা দেখতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বর জানতে পারলেই দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হউন কারণ এবারের ডেঙ্গু অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। এবারের জ্বর আগের থেকে ভিন্য তাই জ্বর আসার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে CBC (Complete Blood Count) এবং Dengue NS1 antigen টেস্ট করবেন।
ডেঙ্গু সংক্রমণের কারণে রক্তের প্লাটিলেট ভেঙে যেতে থাকে। প্রচলিত গুজব অনুযায়ী পেপে পাতার রস খেলে রক্তের প্লাটিলেটের পরিমান বেড়ে যায় যার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কোন ওষুধের মাধ্যমে প্লাটিলেটের পরিমান বাড়ে না। নির্দিষ্ট সময় পর আপনা-আপনিই প্লাটিলেট স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ত্বকে বয়সের ছাপ পরার কারন জেনে নিন! চামড়া ভাজ পড়ার কারণ
ডেঙ্গু জ্বর একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা এবং এর লক্ষণগুলি জানা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ এবং করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
ডেঙ্গুর লক্ষণসমূহ
- হঠাৎ করে উচ্চ তাপমাত্রা (১০২-১০৫°F)
- তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা
- মাংসপেশি ও গাঁটে ব্যথা
- শরীরে লালচে ফুসকুড়ি
- বমি বা বমির ভাব
- পেটে ব্যথা
- মাড়ি ও নাক দিয়ে রক্তপাত
জ্বর
- সাধারণত ১০১-১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
- জ্বর একটানা থাকতে পারে বা পিরিয়ডিকভাবে আসতে পারে।
শরীরে ব্যথা
- মাথাব্যথা, পিঠ ও শরীরের অন্যান্য অংশে ব্যথা।
চোখের পেছনে ব্যথা
- চোখের পেছনে বা সোজা লালচে দাগ (র্যাশ)।
র্যাশ
- চামড়ায় লালচে দাগ।
ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল ডাক্তারের তালিকা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট
ডেঙ্গু নিশ্চিত করার টেস্ট
জ্বরের প্রথম এক থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে এনএস১ এন্টিজেন টেস্ট সবচেয়ে কার্যকর, কারণ এই সময়ে ভাইরাসের একটা প্রোটিন সরাসরি রক্তে ধরা পড়ে। পঞ্চম দিনের পর থেকে আইজিএম এন্টিবডি টেস্ট বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে। আইজিজি টেস্ট মূলত বোঝায় অতীতে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল কি না।
এর পাশাপাশি সিবিসি টেস্ট নিয়মিত করানো হয়, যা প্লেটলেট, হেমাটোক্রিট এবং সাদা রক্তকণিকার মাত্রা মনিটর করতে সাহায্য করে। ক্রিটিক্যাল ফেজে ডাক্তার প্রতিদিন বা দিনে দুইবারও এই টেস্ট করাতে বলতে পারেন।
সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি সাধারণত ১০০ টাকা নির্ধারিত, আর প্রকোপ বেশি থাকলে সরকার এই ফি সাময়িকভাবে কমিয়েও দিয়েছে অতীতে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা নেওয়ার নিয়ম, যদিও কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার এই সীমা না মেনে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে অতীতে। টেস্ট করাতে যাওয়ার আগে দাম জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা
ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট এন্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক, অর্থাৎ জ্বর, ব্যথা, আর শরীরের তরল ভারসাম্য ঠিক রাখার দিকেই মনোযোগ দেওয়া হয়।
জ্বর কমাতে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করা উচিত, তাও ডাক্তারের নির্দেশিত মাত্রায়। অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ ডেঙ্গুতে এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই বিষয়টা অনেকেই জানেন না, আর এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়।
শরীরে পর্যাপ্ত তরল দেওয়া চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস ঘন ঘন খাওয়াতে হবে, কারণ ডেঙ্গুতে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় তরল দেওয়া হয়, আর প্রয়োজনে প্লেটলেট ট্রান্সফিউশন করা হয়। তবে শুধু প্লেটলেট কম দেখেই ট্রান্সফিউশন করা হয় না, রক্তক্ষরণ বা অন্যান্য জটিলতা থাকলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। যাদের জ্বর সহনীয়, খাওয়াদাওয়া করতে পারছেন, প্রস্রাব স্বাভাবিক, আর রক্তপাতের কোনো লক্ষণ নেই, তারা বাসায় থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সেরে উঠতে পারেন। যাদের বয়স বেশি, গর্ভবতী নারী, বা যাদের ডায়াবেটিস কিংবা হৃদরোগের মতো আগে থেকে সমস্যা আছে, তাদের জন্য হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও চিকিৎসা:
- লক্ষণসমূহ:
- হঠাৎ উচ্চ জ্বর (১০২-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)
- মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা
- শরীরে ফুসকুড়ি বা লাল দাগ
- হাড়, গাঁট ও মাংসপেশিতে ব্যথা
- বমি ও পেটের ব্যথা
- শিশুদের ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ এবং খাওয়ায় অনীহা দেখা দেয়।
- চিকিৎসা:
- শিশুদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং তরলজাতীয় খাবার দিতে হবে।
- প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
- শিশুদের আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন বা ক্লোফেনাক দেওয়া যাবে না।
- জ্বর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
২য় বার ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ:
- দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে লক্ষণগুলো আরও তীব্র হয় এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়ে।
- লক্ষণ:
- শারীরিক দুর্বলতা এবং মাথাব্যথা
- তীব্র পেটের ব্যথা
- রক্তচাপ কমে যাওয়া
- নাক, মাড়ি বা মলদ্বার থেকে রক্তপাত
- শ্বাসকষ্ট
- বমি, যা বারবার হতে পারে।
- চিকিৎসা: দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং আইসিইউ-তে পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়:
- মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে মশারির ব্যবহার।
- বাড়ির আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়া।
- মশার বিস্তার রোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।
- দরজা-জানালায় নেট লাগানো।
- মশার স্প্রে বা ক্রিম ব্যবহার।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকার:
- প্রতিরোধ:
- মশার কামড় থেকে বাঁচুন।
- বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন।
- মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করুন।
- প্রতিকার:
- প্রচুর পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করুন।
- ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর কমানোর চেষ্টা করুন, কিন্তু অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলুন।
ডেঙ্গু জ্বরের ৭টি সতর্কীকরণ লক্ষণ:
- তীব্র পেটের ব্যথা
- বারবার বমি
- শ্বাসকষ্ট
- রক্তচাপ কমে যাওয়া
- নাক, মাড়ি, বা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত
- ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণের দাগ
- শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি
ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয়:
- প্রচুর তরল পান করা
- পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকা
- প্যারাসিটামল সেবন করা
- তীব্র লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া

চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- জ্বর হলে অবহেলা করবেন না। সাথে সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি বা অন্যান্য উপসর্গ থাকলে তা অন্য কিছু হতে পারে, তবে জ্বর হলেও সতর্ক থাকুন।
বিশ্রাম:
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। দৈনন্দিন কাজকর্মের পরিমাণ কমিয়ে দিন এবং সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিশ্চিত করুন।
তরল খাবার গ্রহণ:
- ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস, খাবার স্যালাইন ইত্যাদি গ্রহণ করুন।
ঔষধ:
- প্যারাসিটামল: ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত প্যারাসিটামল খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে, দৃষ্টান্ত অনুযায়ী দিনে সর্বোচ্চ চারটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট গ্রহণ করা যেতে পারে।
- অ্যাসপিরিন: ডেঙ্গু জ্বরে অ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা উচিত নয় কারণ এটি রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করতে পারে।
প্ল্যাটিলেট বা রক্তকণিকা নিয়ে চিন্তা
- প্ল্যাটিলেট কাউন্ট: ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্ল্যাটিলেট কাউন্টের পরিবর্তন নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত। সাধারণত, প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১,৫০,০০০ থেকে ৪,৫০,০০০ এর মধ্যে থাকা উচিত।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া
- ক্যাটাগরি ‘এ’: সাধারণত জ্বর থাকে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
- ‘বি’: শরীরে কিছু লক্ষণ থাকে, যেমন পেটের ব্যথা, প্রচুর বমি, অথবা খাওয়ার সমস্যা। এই অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উপকারী হতে পারে।
- ক্যাটাগরি ‘সি’: সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি, যেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে, অবিলম্বে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন এবং ডেঙ্গু সম্পর্কিত সঠিক চিকিৎসা নিন। জ্বর, শরীরের ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, এবং চামড়ায় র্যাশ দেখা দিলে সতর্কতা অবলম্বন করুন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার গ্রহণ করুন।
এই ডেঙ্গু জ্বরের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপুর্ণ, বিশেষ করে যখন এটি বিশেষ সময়ের মধ্যে (জুলাই থেকে অক্টোবর) বেশি দেখা যায়। ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে আপনার প্রশ্নের উত্তর এবং করণীয় বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানানো হলো:
ডেঙ্গু হলে কী করবেন:
- পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিন: শরীরকে বিশ্রাম দিতে হবে যাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত হয়।
- প্রচুর তরল গ্রহণ করুন: ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন পান করুন। এটা শরীরে পানির অভাব পূরণে সাহায্য করে এবং ডিহাইড্রেশন রোধ করে।
- প্যারাসিটামল সেবন করুন: জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল গ্রহণ করা যায়, তবে দিনে ৮টির বেশি নয়।
- পুষ্টিকর খাবার খান: শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
ডেঙ্গু হলে যা করবেন না:
- অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করবেন না: এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই এসব ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে।
- প্লাটিলেট নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না: প্লাটিলেট স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে জ্বর কমে গেলে। তাই প্লাটিলেট নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই।
- পেঁপে পাতার রস বা অন্যান্য ঘরোয়া টোটকা: পেঁপে পাতার রস প্লাটিলেট বাড়ায় এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তাই এসব পদ্ধতি এড়িয়ে চলুন।
- বাড়তি ওষুধ বা চিকিৎসা গ্রহণ করবেন না: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়ার ঝুঁকি নিতে যাবেন না।
ডেঙ্গু জ্বরে কখন হাসপাতালে যেতে হবে
কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি করার সুযোগ নেই। পেটে তীব্র ব্যথা, লাগাতার বমি, মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত, ত্বকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া লালচে বা বেগুনি দাগ, প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যাওয়া, শরীরে অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা ক্লান্তি, আর শ্বাসকষ্ট, এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। জ্বর কমে যাওয়ার পরও এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে সেটাকে ভালো লক্ষণ ভাববেন না।
ডেঙ্গু জ্বরের ধরন বা ক্যাটাগরি অনুযায়ী চিকিৎসা এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে:
- পেটের ব্যথা, বমি, রক্তপাত বা চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণের লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
- রক্তচাপ কমে গেলে অথবা মাড়ি, নাক বা মলদ্বার থেকে রক্তপাত হলে তা বিপজ্জনক হতে পারে, এই অবস্থায় শিরাপথে স্যালাইন দিতে হতে পারে।
ক্যাটাগরি ‘এ’:
- সাধারণত শুধু জ্বর থাকে। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী এই ক্যাটাগরির।
- হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়া যথেষ্ট।
ক্যাটাগরি ‘বি’:
- কিছু লক্ষণ যেমন পেটে ব্যথা, প্রচুর বমি, বা অন্যান্য জটিলতা থাকতে পারে।
- স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অন্তঃসত্ত্বা, জন্মগত সমস্যা, কিডনি বা লিভারের সমস্যা থাকলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো।
ক্যাটাগরি ‘সি’:
- সবচেয়ে গুরুতর, যেখানে লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
ডেঙ্গুর সময়ে আরও সতর্কতা:
- লিভার, হার্ট এবং কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ডেঙ্গুর জন্য বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলা উচিত।
বাড়িতে কী করবেন
ডেঙ্গুতে ঘরোয়া প্রতিকার নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে, তবে সবগুলো সমান কার্যকর না। পেঁপে পাতার রস নিয়ে অনেকে বলে থাকেন এটা প্লেটলেট বাড়ায়, তবে এই বিষয়ে বড় আকারের শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত, তাই এটাকে মূল চিকিৎসার বিকল্প ভাবা ঠিক না। ডাক্তারের চিকিৎসা বাদ দিয়ে শুধু এই ধরনের ঘরোয়া উপায়ে ভরসা করাটা বিপজ্জনক হতে পারে।
যেটা সত্যিই কাজ করে, তা হলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়মিত তরল গ্রহণ, আর হালকা সহজপাচ্য খাবার খাওয়া। ডাবের পানি, স্যুপ, খিচুড়ির মতো খাবার শরীরকে শক্তি জোগায় অথচ হজমে চাপ ফেলে না। জ্বর বেশি থাকলে শরীর মুছে দেওয়া, ঠান্ডা পানির পট্টি দেওয়া, এগুলো আরাম দিতে পারে, তবে এসব শুধু উপসর্গ কমানোর সহায়ক পদ্ধতি, মূল চিকিৎসা না।
বিশ্রাম:
- সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।
তরল খাবার:
- প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ করুন। যেমন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস, এবং খাবার স্যালাইন।
ঔষধ:
- প্যারাসিটামল: জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ আটটি প্যারাসিটামল গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে লিভার, হার্ট বা কিডনি সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- অ্যাসপিরিন, ক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন: এই ধরনের ঔষধ গ্রহণ করা উচিত নয় কারণ এগুলি রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যা করবেন না
প্ল্যাটিলেট কাউন্ট নিয়ে উদ্বেগ:
- প্ল্যাটিলেট কাউন্ট খুব কম হলে বা রক্তপাত দেখা দিলে প্রয়োজনে প্ল্যাটিলেট বা রক্ত দেওয়া যেতে পারে। তবে সাধারণত, প্ল্যাটিলেট বাড়ানোর জন্য পেঁপে পাতা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক চিকিৎসার কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
রক্তচাপ কমে যাওয়া:
- জ্বরের শেষের দিকে রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং মাড়ি, নাক, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হতে পারে। এই অবস্থায় স্যালাইন দেওয়া হতে পারে এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দরকার।
কার জন্য বেশি ঝুঁকি
ডেঙ্গু যে কারো হতে পারে, তবে কিছু গোষ্ঠীর জন্য এটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু এবং বয়স্করা এই তালিকায় সবার আগে থাকেন, কারণ তাদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। গর্ভবতী নারীদের জন্যও ডেঙ্গু বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। যাদের আগে থেকে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বা কিডনির সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রেও জটিলতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে, দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে তাদের অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করেন।
জ্বর হলে দিনে দিনে কী করবেন
প্রথম দিন জ্বর শুরু হলে বিশ্রাম নিন এবং তরল গ্রহণ বাড়িয়ে দিন। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক নিজে নিজে খাবেন না। তৃতীয় দিনের মধ্যে জ্বর না কমলে ডাক্তার দেখান এবং এনএস১ টেস্ট করান।
পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ দিনে, জ্বর কমে গেলেও সতর্ক থাকুন। এই সময়েই ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হয়। শরীরে দুর্বলতা বাড়লে, পেটে ব্যথা হলে, বা বমি হলে দেরি না করে হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। সপ্তম থেকে নবম দিনে যদি কোনো জটিলতা না দেখা দেয়, তাহলে শরীর ধীরে ধীরে রিকভারি ফেজে প্রবেশ করে, তবে এই সময়েও ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
সবশেষে
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে, সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার অবস্থার ওপর ভিত্তি করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রাথমিক লক্ষণ ও চিকিৎসার বিষয়ে সঠিক তথ্য জানলে ডেঙ্গু মোকাবিলা সহজ হবে।
যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতি বা লক্ষণ আপনার উদ্বেগ বাড়ায়, নিশ্চিতভাবেই চিকিৎসকের সাহায্য নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ডেঙ্গু কতদিনে সেরে যায়?
সাধারণত সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে বেশিরভাগ রোগী সেরে ওঠেন, তবে ক্রিটিক্যাল ফেজে জটিলতা দেখা দিলে সময় বেশি লাগতে পারে।
ডেঙ্গুতে কী খাওয়া উচিত?
পর্যাপ্ত পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, আর হালকা সহজপাচ্য খাবার যেমন খিচুড়ি বা স্যুপ খাওয়া ভালো।
ডেঙ্গুতে কী খাওয়া উচিত না?
অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডেঙ্গু কি দ্বিতীয়বার হতে পারে?
হ্যাঁ, ডেঙ্গুর একাধিক সেরোটাইপ আছে, আর ভিন্ন সেরোটাইপে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে অবস্থা আরও জটিল হতে পারে।
প্লেটলেট কমে গেলেই কি বিপদ?
শুধু প্লেটলেট কমে যাওয়া মানেই তাৎক্ষণিক বিপদ না। রক্তপাতের লক্ষণ, রক্তচাপ, এবং পানিশূন্যতার লক্ষণ একসাথে দেখেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।