চাকরি প্রস্তুতি

কীভাবে অনার্স থেকে শুরু করবেন বিসিএস প্রস্তুতি!

কীভাবে অনার্স থেকে শুরু করবেন বিসিএস প্রস্তুতি!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই অনেকে বিসিএস পরীক্ষা প্রস্তুতির পড়াশোনা শুরু করে দেন। আবার অনেকে একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে শুরু করেন, তখনই দিশাহারার মতো অবস্থা দেখা দেয়! তবে সফলদের পরামর্শ হলো অনার্সে পড়াশোনার সময় থেকেই বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করা। নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইলে কিভাবে শুরু করা উচিত তা এখানে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

বিসিএস কি?

বিসিএস- BCS এর পূর্ণ রূপ হচ্ছে Bangladesh Civil Service, যেখানে ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করার জন্য যে পরীক্ষা দিতে হয় তাই আসলে বিসিএস পরীক্ষা। একটা দেশের সরকারি চাকরিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়, একটা হলো সামরিক বা মিলিটারি সার্ভিস, আরেকটা হলো বেসামরিক বা সিভিল সার্ভিস। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (BPSC) গেজেট প্রকাশ করে ক্যাডার হিসেবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ দেয়ার জন্য যে পরীক্ষা গ্রহণ করে সেটাই হলো বিসিএস পরীক্ষা।

বিসিএস ক্যাডার  দুই প্রকার- জেনারেল ও টেকনিক্যাল। জেনারেল ক্যাডার থেকে যে কেউ যে কোনো বিষয় থেকে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি করতে পারেন, কিন্তু টেকনিকাল ক্যাডারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হয়। বর্তমানে ২৬ ধরনের ক্যাডারে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। 

বিসিএসে আবেদন যোগ্যতা 

  • মুক্তিযোদ্ধা/ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা, প্রতিবন্ধী প্রার্থী এবং বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার প্রার্থী ছাড়া আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৩০ বছর। মুক্তিযোদ্ধা/ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা, প্রতিবন্ধী প্রার্থী এবং বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৩২ বছর। 
  • wযে কোনো স্বীকৃত বোর্ড থেকে এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষা পাসের পর চার বছর মেয়াদি শিক্ষা সমাপনী ডিগ্রি অথবা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে। একাধিক তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা কি? শিক্ষাগত, স্বাস্থ্য, বয়স, শারীরিক যোগ্যতা বিস্তারিত

পরীক্ষাপদ্ধতি ও মানবণ্টন

বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতি কি? বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতি- বিষয়সমূহ ও মানবণ্টন বিস্তারিত

বিসিএস পরীক্ষা তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়।

  • প্রিলিমিনারী– ২০০ নম্বরের MCQ Type Preliminary Test ।
  • লিখিত– প্রিলিমিনারি টেস্টে কৃতকার্য প্রার্থীদের জন্য ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা। গড় পাস নম্বর ৫০%
  • মৌখিক– লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্য প্রার্থীদের জন্য ২০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা। পাস নম্বর ৫০%

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে একজন প্রার্থীকে ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ করা হয়। 

যেভাবে অনার্স থেকে শুরু করবেন বিসিএস প্রস্তুতি

পরীক্ষা শুরু হওয়া থেকে ফলাফল পর্জন্ত সময়টা অনেক দীর্ঘমেয়াদী। শুধু পরীক্ষা থেকে ফলাফল নয় বিসিএস প্রস্তুতিটাও দীর্ঘ। তবে অনেক প্রার্থী এই দীর্ঘ প্রস্তুতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। অনার্স লেভেল থেকেই মানসিক প্রস্তুতি এবং বেসিক স্ট্রং করার দিকে গুরুত্ব দেয়া বেশ কাজে আসে। চলুন জেনে নেই বিস্তারিত-

সুনিদ্রষ্ট লক্ষ্য থাকা জরুরী

আপনি কেন ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে বিসিএস ক্যাডারই হবেন তা প্রথম থেকেই নির্ধারণ করে রাখুন। এর ফলে ধৈর্য্য ধরে প্রস্তুতি নেয়াটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।

একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রস্তুতি নয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে অনেকে বিসিএসসহ অনান্য চাকরি পরীক্ষার গাইড বই পড়া শুরু করেন। একাডেমিক পড়াশোনাকে গুরত্ব দেন না। কিন্তু কিছুদিন পড়ে উৎসাহে ভাটা পড়ে। অন্যদিকে একাডেমিক ফলাফল খারাপ হতে থাকে। তারপর স্নাতক সম্পন্ন করার পর অনেকে কাঙ্ক্ষিত চাকরিটা পেয়েও যান। তবে অনেকেই চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। বিসিএস পরীক্ষায় সফল হতে একাডেমিক ফল তেমন প্রয়োজন না হলেও ভালো ফল ভাইভা বোর্ডে আপনার জন্য ইতিবাচক দিক তৈরি করে। একাডেমিক ভালো ফল প্রার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে। তাই কোনোভাবেই একাডেমিক পড়াশোনাকে বাদ দিয়ে বিসিএস বা অন্যান্য চাকরির বই পড়া উচিত হবে না।

সিলেবাস সম্পর্কে ধারণা

বিসিএস প্রশ্ন সিলেবাসের মধ্যে থেকে আসে। আর একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনেই প্রশ্ন করা হয়।

বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা খুঁজে বের করুন

বিগত বছরের প্রশ্ন দেখে নিজের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতার জায়গা সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারবেন। তাহলে প্রস্তুতি শুরু করাটাও সহজ হবে আপনি যদি ইংরেজি গ্রামারে দুর্বল হয়ে থাকেন তাহলে ইংরেজির বেসিক ক্লিয়ার করুন।  আপনি যদি অংকে কাঁচা হয়ে থাকেন তবে অংকের উপর জোর দিন। নিজের দুর্বলতার জায়গাটা ধরে কাজ করুন।

ভাষার দক্ষতা

বাংলা ও ইংরেজি দুটি ভাষাতেই দক্ষতা খুবই জরুরি। লিখিততে যেহেতু বাংলা ও ইংরেজি উভয় মাধ্যমেই লিখতে হয় তাই ফ্রিহ্যান্ড রাইটিং আয়ত্তে আনতে হবে। প্রতিদিন যে কোনো বিষয়ে ১/২ পেইজ বানিয়ে লেখার অভ্যাস করুন। পরবর্তীতে এই অভ্যাস কাজে দিবে।

নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করুন

দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করা উচিত। আর এই অভ্যাসটা আগে থেকে না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয জীবন থেকে শুরু করতে পারলে ভালো প্রতিদিন একটি বাংলা পত্রিকা ও একটি ইংরেজি পত্রিকা পড়তে হবে। বিশেষ করে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় পাতা, আন্তর্জাতিক পাতা, অর্থনীতির পাতা পড়তে পারলে দারুণ কাজে দেবে। পত্রিকা পড়ার অভ্যাস বিসিএসসহ অন্যান্য চাকরির পরীক্ষার প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় কাজে দেবে। যাদের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস নেই বা পড়ার সুযোগ নেই, তারা মাসিক কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স পড়ুন।

সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিন

বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম আপনাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে অনেকাংশে। ডিবেটিং সোসাইটি, আবৃত্তি সংগঠন, সায়েন্স ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনগুলো অভিজ্ঞতা অর্জনে অত্যন্ত উপযোগী। সাংগঠনিক ও নেতৃত্বদানের দক্ষতা বিকাশ করে এ ক্লাবগুলো। প্রবলেম সলভিং স্কিল বা সুন্দর প্রেজেন্টেশন স্কিলও এখান থেকে গড়ে তোলা সম্ভব। তাই পরিমিত পরিমাণে এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজে অংশ নিতে কখনোই পিছপা হওয়া যাবে না। 

পড়ে ফেলুন বিষয়ভিত্তিক বই

বিশ্ববিদালয়ের  ৩য়  বর্ষে কিছু বিখ্যাত বই পড়ে ফেলুন যেমন “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”, “লালনীল দীপাবলি” এই বইগুলো থেকে বিসিএসে কিছু প্রশ্ন থাকে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কিত বই, মুক্তিযুদ্ধের উপর বইগুলো পড়ে ফেলা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষ থেকে বিসিএস এর সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিটি বিষয়ের জন্য বিষয়ভিত্তিক বই পড়া শুরু করা উচিত। বিসিএস প্রিলির যেকোনো ভালো সিরিজের (যেমন এমপিথ্রি/প্রফেসর’স/অ্যাসিওরেন্স/ওরাকল) বইগুলো পড়ুন এবং বিসিএস প্রিলিমিনারি অ্যানালাইসিস বইটি ভালোভাবে শেষ করুন। এছাড়া ৪র্থ-১০ম শ্রেণির ম্যাথ ও ৯ম-১০ম শ্রেণির ভূগোল ও পরিবেশ, বাংলা ব্যাকরণ বইটি পড়ুন।

পরিমিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করুন

অপ্রয়োজনীয় জিনিস পড়লে আপনার সময়ই নষ্ট হবে। তাই বেশি না পড়ে প্রশ্ন এনালাইসিস করে সিলেবাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো পড়ুন। অতিরিক্ত পড়ার ফলে পরীক্ষার হলে গিয়ে কনফিউজড হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

যোগাযোগ দক্ষতা দরকারি

বর্তমান সময়ে ক্যারিয়ারে ভালো করতে হলে যোগাযোগ দক্ষতা জরুরী বিষয়। এই দক্ষতা থাকলে চাকরির ভাইভায় নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে।

টিউশনি

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকেই আর্থিক লাভের জন্য টিউশনি করে থাকেন। টিউশনি শুধু আর্থিকভাবে লাভবান করে না, বরং একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চাকরির প্রস্তুতির জন্যও সহায়ক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে সপ্তম থেকে নবম-দশম শ্রেণির ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ের টিউটর হতে পারলে ভালো। আর এসব বিষয়ে বিসিএস পরীক্ষায় কাজে দেবে।

‘অতিরিক্ত’ নয়!

জীবনের অল্প সময়ে মানুষকে অনেক কিছু করতে হয়, জানতে হয়, শিখতে হয়, উপভোগ করতে হয়। তাই কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। শুধু মুখ বুজে পড়ার টেবিলে থাকলে বাইরের দুনিয়াকে দেখা হয় না। আর তাই সহশিক্ষা কার্যক্রম, একাডেমিক পড়াশোনা, চাকরির প্রস্তুতি—সব কিছুর মধ্যে একটা ভারসাম্য রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে।

সর্বোপরি স্রষ্টার ওপর ভরসা, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য্য রাখুন। বিসিএস কঠিন তবে অসম্ভব নয়।  

Related Articles

Back to top button
error: