হেলিকপ্টারে চড়ার ইচ্ছা থাকলেও বেশিরভাগ মানুষ আটকে যান একটা জায়গায়, কাকে ফোন করব, কোথায় গেলে পাব? বিয়ের অনুষ্ঠান হোক, জরুরি রোগী, শুটিং বা শুধু আকাশ থেকে দেশটা দেখা, ভাড়া নেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে দেশে কোন কোম্পানিগুলো এই সেবা দেয়, কত খরচ পড়ে আর বুকিং দেওয়ার নিয়ম কী। এই এক লেখাতেই সব গুছিয়ে দিলাম, যাতে ফোন তুলে সরাসরি কাজে নামতে পারেন।
কেন আগে থেকে জেনে রাখা জরুরি
হেলিকপ্টার ট্যাক্সির মতো নয় যে রাস্তায় হাত তুললেই পাওয়া যাবে। প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য আগে থেকে বুকিং দিতে হয়, অগ্রিম টাকা দিতে হয়, আর সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি লাগে। তাই কোন কোম্পানির কাছে কোন হেলিকপ্টার আছে, ভাড়া কত আর বাড়তি খরচ কী কী, এসব আগে জানা থাকলে শেষ মুহূর্তে ঠকবেন না, সময়ও বাঁচবে।
বাংলাদেশের প্রধান হেলিকপ্টার ভাড়া কোম্পানি
দেশে হাতে গোনা কয়েকটা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত হেলিকপ্টার ভাড়া দেয়। নিচে প্রতিটির বিস্তারিত দিলাম। তবে মনে রাখবেন, ভাড়া আর ফোন নম্বর সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই বুকিংয়ের আগে সরাসরি কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিন।
স্কয়ার এয়ার লিমিটেড দেশের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি। এদের ছয় আসনের বেল-৪০৭ আর চার আসনের রবিনসন R-৬৬ হেলিকপ্টার আছে। বড় অনুষ্ঠান বা বেশি যাত্রীর জন্য এদের সেবা জনপ্রিয়। যোগাযোগ: স্কয়ার সেন্টার, ৪৮ মহাখালী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা।
সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স তুলনামূলক কম রেটে সাধারণ যাত্রার সুবিধা দেয়, পাশাপাশি সিনেমার শুটিং আর লিফলেট বিতরণের মতো বাণিজ্যিক কাজও করে। এদের ভালো দিক হলো ন্যূনতম ৩০ মিনিটের জন্যও হেলিকপ্টার নেওয়া যায়, তাই অল্প সময়ের কাজের জন্য সাশ্রয়ী। যোগাযোগ: টাওয়ার হেমলেট, ১৬ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশন লিমিটেডের কাছে ছয় আসনের EC-130 B4 হেলিকপ্টার পাওয়া যায়, যেটা আরামদায়ক ও নির্ভরযোগ্য মডেল হিসেবে পরিচিত। যোগাযোগ: ৪০ শহীদ তাজউদ্দীন সরণি, তেজগাঁও, ঢাকা।
সিকদার গ্রুপের তিনটি হেলিকপ্টার আছে, সাত আসন আর তিন আসন দুই ধরনের সুবিধা মেলে। ছোট দল হলে তিন আসনের অপশন খরচ কমিয়ে দেয়। যোগাযোগ: রাজ ভবন, দ্বিতীয় তলা, ২৯ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা।
প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য তুলনামূলক কম খরচে সেবা দেওয়ার কথা বলছে প্রবাসীর হেলিকপ্টার। প্যাকেজ আর সর্বশেষ রেট জানতে সরাসরি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাই ভালো।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের যাত্রীদের জন্য চট্টগ্রাম-ঢাকা ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে শাটল ধাঁচের সেবা চালু করেছে চিটাগাং হেলিকপ্টার অ্যান্ড এয়ার সার্ভিস। এরা কয়েকটি হেলিকপ্টার দিয়ে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি একটি হেলিকপ্টার এয়ার অ্যাম্বুলেন্স হিসেবেও রেখেছে।
এসব ছাড়াও পিএইচপি গ্রুপ, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল, বিআরবি কেবল, মেঘনা গ্রুপ, ইয়াং ইয়াং (আরিয়ান) গ্রুপ আর এমএস বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া দিয়ে থাকে।
এক নজরে কোম্পানি ও আনুমানিক ভাড়া
নিচের টেবিলটা ধারণার জন্য, চূড়ান্ত ভাড়া বুকিংয়ের সময় কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত করতে হবে, কারণ জ্বালানির দাম আর চাহিদা অনুযায়ী রেট ওঠানামা করে।
হেলিকপ্টার দাম কত ২০২৬ | ভাড়া ও পার্সোনাল
| কোম্পানি | হেলিকপ্টার / আসন | প্রতি ঘণ্টা আনুমানিক ভাড়া | বাড়তি খরচ |
|---|---|---|---|
| স্কয়ার এয়ার | বেল-৪০৭ (৬ জন) | ১,১৫,০০০–১,২০,০০০ টাকা | অপেক্ষা ৬,০০০/ঘণ্টা, বীমা ২,০০০/ঘণ্টা |
| স্কয়ার এয়ার | রবিনসন R-৬৬ (৪ জন) | প্রায় ৭৫,০০০ টাকা | অপেক্ষা ও বীমা প্রযোজ্য |
| সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স | সাধারণ যাত্রা | প্রায় ৫৫,০০০ টাকা | ন্যূনতম ৩০ মিনিট, অপেক্ষা ৫,০০০/ঘণ্টা + ভ্যাট |
| ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশন | EC-130 B4 (৬ জন) | প্রায় ১,০০,০০০ টাকা | অপেক্ষা ৫,০০০/ঘণ্টা + ১৫% ভ্যাট |
| সিকদার গ্রুপ | ৭ আসন | প্রায় ১,১৫,০০০ টাকা | অপেক্ষা ৭,০০০/ঘণ্টা + ভ্যাট |
| সিকদার গ্রুপ | ৩ আসন | প্রায় ৭২,০০০ টাকা | অপেক্ষা ৭,০০০/ঘণ্টা + ভ্যাট |
বাণিজ্যিক কাজের জন্য, যেমন শুটিং বা লিফলেট বিতরণ, ভাড়া সাধারণ যাত্রার চেয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি পড়তে পারে। তাই বুকিংয়ের সময় আপনার কাজের ধরন স্পষ্ট করে বলুন।
রুট অনুযায়ী খরচ কীভাবে হিসাব হয়
এখানে একটা ভুল ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। বাসের মতো হেলিকপ্টারের রুট-ভিত্তিক ফিক্সড ভাড়া সাধারণত হয় না। বেশিরভাগ কোম্পানি ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নেয়, তাই ঢাকা টু কক্সবাজার বা ঢাকা টু চট্টগ্রাম যেতে কত পড়বে তা নির্ভর করে ওই পথ উড়তে কত সময় লাগে তার ওপর।
ধরুন আপনি একটা ছয় আসনের হেলিকপ্টার ঘণ্টায় ১,১৫,০০০ টাকায় নিলেন। যদি ঢাকা থেকে কোনো গন্তব্যে যেতে এক ঘণ্টা লাগে আর ফিরতেও এক ঘণ্টা, তাহলে শুধু ওড়ার খরচই দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি, সঙ্গে গন্তব্যে হেলিকপ্টার দাঁড় করিয়ে রাখলে অপেক্ষার চার্জ আর ভ্যাট। তাই যত দূর আর যত বেশি সময় হেলিকপ্টার আপনার সঙ্গে থাকবে, খরচ তত বাড়বে।
ব্যতিক্রম হলো শাটল ধাঁচের সেবা, যেমন চট্টগ্রামের রুট-ভিত্তিক সার্ভিস, যেখানে নির্দিষ্ট রুটে আসন অনুযায়ী ভাড়া ধরা হতে পারে। এ ধরনের প্যাকেজের রেট আলাদা, তাই নির্দিষ্ট রুটের জন্য সরাসরি ওই কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
এয়ার অ্যাম্বুলেন্স: জরুরি রোগী পরিবহন
হেলিকপ্টার ভাড়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো জরুরি রোগী পরিবহন। দূরের কোনো জায়গা থেকে রাজধানীর হাসপাতালে দ্রুত রোগী আনতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রাণ বাঁচাতে পারে। দেশের কয়েকটি কোম্পানি এই সেবা দেয়, এবং সত্যিকারের জরুরি অবস্থায় সিভিল এভিয়েশন কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেও দ্রুত অনুমতি দিয়ে থাকে। তবে এ ধরনের ফ্লাইটে চিকিৎসা সরঞ্জাম আর প্রশিক্ষিত লোকবল দরকার হয়, তাই খরচ সাধারণ ভাড়ার চেয়ে বেশি পড়ে। জরুরি দরকার হলে আগে থেকেই কোন কোম্পানি এই সেবা দেয় তা জেনে নম্বর হাতের কাছে রাখুন।
কোন ক্ষেত্রে কোন সেবা সেরা
| প্রয়োজন | কোন অপশন ভালো |
|---|---|
| বিয়ে, গায়ে হলুদ, বরযাত্রা | বড় ৬-৭ আসনের হেলিকপ্টার, ছবির জন্য আকর্ষণীয় |
| অল্প সময়ের শখের ফ্লাইট | সাউথ এশিয়ানের ৩০ মিনিটের অপশন |
| ছোট দল, কম বাজেট | ৩-৪ আসনের হেলিকপ্টার |
| শুটিং, লিফলেট, বাণিজ্যিক কাজ | বাণিজ্যিক প্যাকেজ দেয় এমন কোম্পানি |
| জরুরি রোগী পরিবহন | এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সুবিধাসম্পন্ন কোম্পানি |
| চট্টগ্রাম অঞ্চলের যাত্রা | রুট-ভিত্তিক শাটল সার্ভিস |
ধাপে ধাপে কীভাবে বুকিং দেবেন
প্রথমে আপনার দরকার ঠিক করুন — কতজন যাত্রী, কোথায় যাবেন, কত সময় লাগবে আর হেলিকপ্টার কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে। এই তথ্যগুলো ছাড়া কোম্পানি সঠিক রেট দিতে পারবে না।
এরপর অন্তত দুই-তিনটা কোম্পানিকে ফোন করে লিখিত কোটেশন চান, যেখানে ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া, অপেক্ষার চার্জ, বীমা আর ভ্যাট আলাদা করে লেখা থাকবে। মৌখিক কথায় ভরসা করবেন না, কারণ শেষে বাড়তি খরচ যোগ হয়ে বিল ফুলে যেতে পারে।
পছন্দ ঠিক হলে বুকিং নিশ্চিত করুন। সাধারণত মোট ভাড়ার ৫০ শতাংশ অগ্রিম দিতে হয়, বাকিটা উড্ডয়নের আগে। হেলিকপ্টারের নির্দিষ্ট রুট নেই বলে কোথায় কেন যাচ্ছেন তা উড্ডয়নের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে সিভিল এভিয়েশনকে জানাতে হয়, যা কোম্পানিই সাধারণত সামলে দেয়। সবশেষে আবহাওয়া আর সময়সূচি আগের দিন আরেকবার নিশ্চিত করে নিন।
খরচ কমানোর বাস্তব টিপস
হেলিকপ্টার যত কম সময় মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকবে তত খরচ কম, তাই গন্তব্যে নামার পর সব কাজ আগে থেকে গুছিয়ে রাখুন। বড় দল হলে আসন ভাগাভাগি করে নিলে মাথাপিছু খরচ কমে। আবহাওয়া অনুকূল মৌসুম বেছে নিলে ফ্লাইট বাতিলের ঝুঁকি কমে, ফলে অগ্রিম টাকা আটকে থাকার ভয় থাকে না। আর সম্ভব হলে এক দিকের বদলে আসা-যাওয়ার পুরো প্ল্যান একবারেই জানিয়ে দিন, যাতে কোম্পানি একটানা শিডিউল করে খরচ কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।
ভাড়া নেওয়ার আগে যা যাচাই করবেন (How to choose)
দাম সবার আগে নয়, নিরাপত্তা আগে। কোম্পানির বৈধ লাইসেন্স আছে কিনা, হেলিকপ্টারের রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকঠাক হয় কিনা আর পাইলট অভিজ্ঞ কিনা, এসব জেনে নিন। বীমা সুবিধা আছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করুন, কারণ আকাশযাত্রায় ঝুঁকি থাকে।
এরপর দেখুন আপনার যাত্রী সংখ্যা আর বাজেটের সঙ্গে কোন হেলিকপ্টার মেলে। চারজনের জন্য ছয় আসনের বড় হেলিকপ্টার নেওয়া মানে অযথা বেশি টাকা গোনা। সবশেষে রিভিউ আর পরিচিতদের অভিজ্ঞতা শুনে নিন, যে কোম্পানি সময়মতো সেবা দেয় আর লুকানো চার্জ ধরায় না, সেটাই বেছে নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশে কোথায় হেলিকপ্টার ভাড়া পাওয়া যায়?
স্কয়ার এয়ার, সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স, ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশন আর সিকদার গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই সেবা দেয়, বেশিরভাগের অফিস ঢাকায়।
হেলিকপ্টার ভাড়া করতে কত আগে বুকিং দিতে হয়?
সাধারণত উড্ডয়নের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে, তবে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত অনুমতিও মেলে।
বুকিংয়ে কত টাকা অগ্রিম লাগে?
সাধারণত মোট ভাড়ার ৫০ শতাংশ অগ্রিম, বাকিটা উড্ডয়নের আগে।
সবচেয়ে কম সময়ের জন্য ভাড়া নেওয়া যায় কত?
কিছু কোম্পানি ন্যূনতম ৩০ মিনিটের জন্যও হেলিকপ্টার ভাড়া দেয়।
জরুরি রোগী পরিবহনে হেলিকপ্টার পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, কয়েকটি কোম্পানি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেয় এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত অনুমতি পাওয়া যায়।
এবার আপনি জানেন কোথায় ফোন করতে হবে, কী জিজ্ঞেস করতে হবে আর কীভাবে খরচ বাঁচাতে হবে। আপনার দরকার আর বাজেট বুঝে কোম্পানি বেছে নিন, আর চূড়ান্ত রেট সবসময় কথা বলে নিশ্চিত করে নিন।



