ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স

বেস্ট সেভিংস একাউন্ট বাংলাদেশ: কোন ব্যাংকে বেশি ইন্টারেস্ট? (২০২৬)

সেভিংস একাউন্ট খোলার আগে বেশিরভাগ মানুষ একটাই প্রশ্ন করেন, কোন ব্যাংকে বেশি সুদ পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে সেভিংস একাউন্টের আসল হিসাবটা তত সহজ নয় যতটা মনে হয়। একই ব্যাংকে আপনার ব্যালেন্সের ওপর ভিত্তি করে সুদের হার বদলে যায়, ইসলামী ব্যাংকে সুদের বদলে লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে মুনাফা দেওয়া হয়, আর সুদ থেকে ট্যাক্সও কাটা হয়। এই লেখায় আমি পুরো বিষয়টা বাস্তব সংখ্যা দিয়ে ভেঙে দেখাব, যাতে আপনি নিজের টাকার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এক নজরে উত্তর

আপনার হাতে যদি সময় কম থাকে, তাহলে মূল কথাটা এখানেই পেয়ে যাবেন। সাধারণ সেভিংস একাউন্টে সুদের হার সাধারণত বছরে ০.৫০% থেকে ৩.৫০%-এর মধ্যে থাকে, আর এটা নির্ভর করে আপনার একাউন্টে কত টাকা জমা আছে তার ওপর। বেশি ব্যালেন্স মানেই বেশি সুদ, কম ব্যালেন্স মানেই কম সুদ। যদি আপনার লক্ষ্য শুধু বেশি রিটার্ন হয় এবং টাকাটা তাৎক্ষণিক দরকার না পড়ে, তাহলে সাধারণ সেভিংস একাউন্টের চেয়ে ডিপিএস, এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র অনেক বেশি লাভজনক, কারণ এগুলোর সুদের হার সাধারণত ৬% থেকে ১১% বা তার বেশি পর্যন্ত যায়। সেভিংস একাউন্ট মূলত তারল্যের জন্য, লাভের জন্য নয়। এই পার্থক্যটা বোঝাই এই পুরো লেখার মূল কথা।

সেভিংস একাউন্টের সুদ আসলে কীভাবে ঠিক হয়

বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন একটা ব্যাংকের একটাই সুদের হার থাকে। বাস্তবে তা নয়। প্রায় প্রতিটা ব্যাংক তাদের সেভিংস একাউন্টের সুদকে কয়েকটা ব্যালেন্স স্তরে ভাগ করে রাখে, আর প্রতিটা স্তরে আলাদা হার প্রযোজ্য হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, BRAC Bank-এর ২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর রেট শিটে দেখা যায়, নিয়মিত সেভিংস একাউন্টে সর্বনিম্ন ব্যালেন্স স্তরে সুদ ০.৫০%-এর কাছাকাছি শুরু হয়ে, ব্যালেন্স ৫ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে সেই হার বেড়ে প্রায় ৩.৫০% পর্যন্ত ওঠে। নারী গ্রাহকদের জন্য বিশেষ TARA একাউন্টে একই ব্যালেন্স স্তরে সাধারণ একাউন্টের চেয়ে কিছুটা বেশি হার দেওয়া হয়। ছাত্র বা শিশুদের জন্য আলাদা স্কিমেও প্রায়ই একটা ফ্ল্যাট রেট থাকে, যেমন BRAC-এর Future Star একাউন্টে বয়স ১৮-এর নিচে হলে ব্যালেন্স যাই হোক, ৩.৫০% হারে সুদ পাওয়া যায়।

এই তথ্যটা এখানে দেওয়ার একটাই কারণ, ব্যাংক তুলনা করার সময় শুধু “কত পার্সেন্ট” জিজ্ঞেস না করে “কোন ব্যালেন্সে কত পার্সেন্ট” জিজ্ঞেস করা জরুরি। আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এই হারগুলো স্থায়ী নয়। ব্যাংকগুলো তাদের ALCO (Asset Liability Committee) সার্কুলার অনুযায়ী প্রতি কয়েক মাস পরপর রেট রিভিউ করে। তাই যেকোনো আর্টিকেলে (এই লেখাসহ) দেখা নির্দিষ্ট সংখ্যা সময়ের সাথে বদলে যেতে পারে। খোলার আগে সবসময় ব্যাংকের নিজস্ব রেট শিট বা শাখায় গিয়ে সর্বশেষ হার যাচাই করে নেওয়া উচিত।

প্রচলিত ব্যাংক বনাম ইসলামী ব্যাংক: সুদ নাকি মুনাফা

বাংলাদেশে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো (যেমন Islami Bank Bangladesh) সুদ শব্দটাই ব্যবহার করে না। তারা চলে মুদারাবা নীতিতে, অর্থাৎ গ্রাহকের জমা করা টাকা ব্যাংক বিনিয়োগ করে, তার লাভের একটা অংশ গ্রাহককে দেওয়া হয়। ব্যাংক তার বিনিয়োগ আয়ের ন্যূনতম ৬৫% মুদারাবা হিসাবধারীদের মধ্যে বণ্টন করে। এই মুনাফা বছরে দুইবার সাময়িকভাবে দেওয়া হয়, বছর শেষে চূড়ান্ত হিসাব করে সমন্বয় করা হয়। তাই ইসলামী ব্যাংকে সাধারণ সেভিংসের মুনাফার হার প্রচলিত ব্যাংকের সুদের মতো আগে থেকে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, এটা ব্যাংকের প্রকৃত ব্যবসায়িক ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে।

তবে ইসলামী ব্যাংকের মেয়াদি বা স্কিমভিত্তিক সঞ্চয় হিসাবগুলোতে হার অনেক স্পষ্ট এবং সাধারণ সেভিংসের চেয়ে বেশ বেশি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর রেট অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মুদারাবা স্পেশাল সেভিংস (পেনশন) স্কিমে ৬ মাস থেকে ১ বছর মেয়াদে ৫%, ৩ থেকে ৪ বছর মেয়াদে ৬%, আর ১০ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে ৭% থেকে ৮% পর্যন্ত মুনাফা দেওয়া হয়। এখান থেকেই বোঝা যায়, ইসলামী হোক বা প্রচলিত, দুই ধরনের ব্যাংকেই একটা নিয়ম সবসময় সত্যি: টাকা যত বেশি সময়ের জন্য বেঁধে রাখবেন, রিটার্ন তত বেশি পাবেন। তাৎক্ষণিক তোলার সুবিধার বিনিময়ে সবসময় কিছুটা রিটার্ন ছাড় দিতে হয়।

সেভিংস একাউন্ট, ডিপিএস, এফডিআর আর সঞ্চয়পত্র গুলিয়ে ফেলবেন না

এই চারটা জিনিসকে বাংলায় প্রায়ই একই বাক্সে ফেলে আলোচনা করা হয়, যদিও এরা সম্পূর্ণ আলাদা প্রোডাক্ট। সেভিংস একাউন্ট হলো তাৎক্ষণিক তোলার সুবিধাসহ সাধারণ জমার হিসাব, সুদ সবচেয়ে কম। ডিপিএস (মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প) হলো প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্ক জমা দেওয়ার স্কিম, মেয়াদ শেষে ভালো একটা অঙ্ক হাতে আসে, সুদও সেভিংসের চেয়ে বেশি। এফডিআর হলো এককালীন বড় অঙ্ক একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জমা রাখা, মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত হাত দেওয়া যায় না, সুদ ডিপিএসের কাছাকাছি বা তার বেশি। আর সঞ্চয়পত্র সম্পূর্ণ আলাদা, এটা ব্যাংকের প্রোডাক্টই না, বরং সরকারের জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মাধ্যমে কেনা একটা সরকারি সঞ্চয় উপকরণ, যার মুনাফার হার সাধারণত ব্যাংকের যেকোনো ডিপোজিটের চেয়ে বেশি, তবে এতে কেনার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া আছে।

আমাদের এই লেখার লক্ষ্য সেভিংস একাউন্ট নিয়ে, কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি মানুষ খোলে এবং সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয় এখানেই। কেউ যদি প্রশ্ন করেন “ব্যাংকে টাকা রাখলে ৯% সুদ পাওয়া যায় শুনেছি,” সেটা আসলে দেশের সামগ্রিক গড় ডিপোজিট রেটের কথা বলছে, যেখানে এফডিআরের মতো উচ্চ-সুদের প্রোডাক্ট মিশে থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে সব ধরনের আমানত মিলিয়ে গড় সুদের হার ২০২৫ সালে ৯.৩৫%-এ পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের ৮.৫২% থেকে বেশি। কিন্তু এই সংখ্যাটা প্লেইন সেভিংস একাউন্টের প্রতিনিধিত্ব করে না, সেভিংস একাউন্টের হার এর ধারেকাছেও যায় না। এই পার্থক্যটা না বুঝলে আপনি ভুল প্রোডাক্ট নিয়ে হতাশ হবেন।

প্রোডাক্টতারল্যসাধারণ রিটার্ন রেঞ্জসেরা কার জন্য
সেভিংস একাউন্টতাৎক্ষণিক তোলা যায়০.৫০% – ৩.৫০%দৈনন্দিন লেনদেন, জরুরি তহবিল
ডিপিএসমেয়াদ শেষে, আগে ভাঙালে জরিমানাসাধারণত ৬% – ৯%নিয়মিত মাসিক সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়া
এফডিআরমেয়াদ শেষেসাধারণত ৭% – ১০%+একসঙ্গে বড় অঙ্ক জমা রাখা
সঞ্চয়পত্রমেয়াদ শেষে, কেনার সীমা আছেব্যাংকের চেয়ে সাধারণত বেশিসর্বোচ্চ নিরাপদ দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন

আপনার সুদ থেকে কত ট্যাক্স কাটা হবে

এই অংশটা বেশিরভাগ আর্টিকেল এড়িয়ে যায়, অথচ এটা আপনার হাতে আসা প্রকৃত টাকার অঙ্ককে সরাসরি প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা টাকার সুদ থেকে উৎসে কর কাটা হয়, আর এই কাটার হার নির্ভর করে আপনার টিআইএন (TIN, ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) আছে কি না তার ওপর। টিআইএন থাকলে সুদের ওপর ১০% কর কাটা হয়, না থাকলে সেই হার বেড়ে ১৫% হয়ে যায়। অর্থাৎ টিআইএন না থাকার কারণে আপনি প্রতি বছর সুদের একটা বড় অংশ বাড়তি হারিয়ে ফেলছেন। যাদের এখনো টিআইএন নেই, তারা NBR-এর ই-টিআইএন সিস্টেম থেকে সম্পূর্ণ ফ্রিতে ও অনলাইনে টিআইএন নিতে পারেন, প্রক্রিয়াটা সাধারণত এক বসাতেই শেষ হয়ে যায়।

একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার, এই ১০% বা ১৫% কর কোনো জরিমানা নয়, এটা সবার জন্যই প্রযোজ্য নিয়ম, আপনার আয় করযোগ্য হোক বা না হোক। যাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তারা বছর শেষে রিটার্ন জমা দিয়ে কেটে নেওয়া কর ফেরত দাবি করতে পারেন। তাই টিআইএন নেওয়াটা শুধু কর কম কাটার জন্য না, ভবিষ্যতে টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার টাকা কতটা নিরাপদ: আমানত বীমার নতুন সীমা

এই তথ্যটা একেবারে সাম্প্রতিক এবং অনেক পুরোনো আর্টিকেলে এখনো পুরোনো সংখ্যা রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে “আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬” পাস হয়েছে, যা পুরোনো ব্যাংক আমানত বীমা আইন, ২০০০-কে প্রতিস্থাপন করেছে। এই নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়িত হয়ে গেলে প্রতি আমানতকারী সর্বোচ্চ যে পরিমাণ টাকা ফেরত পাবেন, তা আগের ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এই সীমা প্রতি তিন বছর পরপর একটা পরিচালনা পর্ষদ পর্যালোচনা করবে, যার চেয়ারম্যান থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

এর ব্যবহারিক অর্থ হলো, যদি আপনার একটা ব্যাংকে ২ লাখ টাকার বেশি জমা থাকে, আর সেই ব্যাংক কোনোভাবে সমস্যায় পড়ে, তাহলে ২ লাখ টাকার ওপরের অংশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এই বীমা কাঠামো দেয় না। এটা কোনো আতঙ্কের কথা না, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমনিতে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু এটা জানা থাকলে বড় অঙ্কের টাকা একাধিক ব্যাংকে ভাগ করে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট দেখতে পারেন।

শুধু সুদের হার দেখে ব্যাংক বাছাই করা কেন ভুল

সুদের হার একমাত্র মানদণ্ড হলে সবাই একই ব্যাংকে ছুটতেন। বাস্তবে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েকটা বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়। প্রথমত, ন্যূনতম ব্যালেন্স রাখার শর্ত, অনেক ব্যাংকে নির্দিষ্ট অঙ্কের নিচে ব্যালেন্স নামলে চার্জ কাটে বা সুদ শূন্য হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, সার্ভিস চার্জ, বছরে একবার নেওয়া মেইনটেনেন্স ফি সুদের লাভকে সহজেই খেয়ে ফেলতে পারে, বিশেষ করে ছোট ব্যালেন্সে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যাংকিং কতটা ভালো, দৈনন্দিন লেনদেনে অ্যাপ ভালো না হলে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ে। চতুর্থত, শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি, যদি আপনি প্রায়ই ক্যাশ তোলেন বা জমা দেন, তাহলে এটিএম কতদূরে সেটা সুদের হারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই কারণেই “সেরা ব্যাংক” বলে কোনো একক উত্তর নেই, বরং “আপনার জন্য সেরা ব্যাংক” খুঁজে বের করাটাই আসল কাজ। যিনি মাসে একবার বেতন তুলে বাকি সময় মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করেন, তার প্রয়োজন যিনি প্রতিদিন দোকানের ক্যাশ জমা দেন তার থেকে আলাদা।

কীভাবে বেছে নেবেন: পরিস্থিতি অনুযায়ী গাইড

যদি আপনি একজন ছাত্র বা নতুন চাকরিজীবী হন, প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শূন্য বা কম ন্যূনতম ব্যালেন্সের একাউন্ট, যেখানে সুদ কম হলেও কোনো সমস্যা নেই কারণ মূল লক্ষ্য আপাতত টাকা জমানোর অভ্যাস গড়া, বেশি রিটার্ন পাওয়া নয়। ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট স্টুডেন্ট সেভিংস প্রোডাক্ট সাধারণত সবচেয়ে কম শর্তে পাওয়া যায়।

যদি আপনার হাতে বড় অঙ্কের টাকা জমছে এবং সেটা আপাতত দরকার নেই, সেভিংস একাউন্টে ফেলে না রেখে তার একটা অংশ ডিপিএস বা এফডিআরে সরিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, শুধু হাতে রাখার মতো জরুরি তহবিলটুকু সেভিংসে রেখে দিন।

যদি আপনি ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য ঘন ঘন টাকা জমা ও তোলা করেন, তাহলে সুদের হারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো লেনদেনের সীমা, চার্জ কাঠামো এবং মোবাইল ব্যাংকিং বা এজেন্ট ব্যাংকিং সংযোগ। এখানে ডিজিটাল অগ্রগামী ব্যাংকগুলোর অ্যাপ-ভিত্তিক সুবিধা কাজে লাগে।

যদি আপনি ধর্মীয় কারণে সুদভিত্তিক লেনদেন এড়াতে চান, ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা সেভিংস একাউন্টই একমাত্র পথ, তবে মনে রাখবেন এখানে মুনাফা প্রতি বছর একই থাকবে এই নিশ্চয়তা নেই, এটা ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফার ওপর নির্ভরশীল।

আর যদি আপনার লক্ষ্য একেবারে নিরাপত্তা, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত বা ঝুঁকি এড়াতে চাওয়া মানুষদের জন্য, ২ লাখ টাকার বীমা সীমা মাথায় রেখে টাকা একাধিক ব্যাংকে ভাগ করে রাখা এবং সরকারি সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে পোর্টফোলিও সাজানো ভালো কৌশল।

সেভিংস একাউন্ট খোলার ধাপ

প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট, দুই কপি ছবি, এবং নমিনির তথ্য প্রস্তুত রাখুন। যদি টিআইএন থাকে তার কপিও সঙ্গে নিন, কারণ এটা পরে কর কাটার হার কমাতে সরাসরি কাজে আসবে। এরপর পছন্দের ব্যাংকের শাখায় গিয়ে বা অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এখন সম্পূর্ণ অনলাইনে e-KYC এর মাধ্যমে আবেদন করা যায়। আবেদনের সময় কোন ধরনের সেভিংস প্রোডাক্ট আপনার জন্য উপযুক্ত তা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে নিন, কারণ প্রায় প্রতিটা ব্যাংকেই একাধিক সেভিংস ভ্যারিয়েন্ট থাকে। প্রাথমিক জমার ন্যূনতম অঙ্ক ব্যাংকভেদে ভিন্ন, সাধারণত ৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে থাকে। একাউন্ট খোলার পর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ সক্রিয় করে নিন এবং প্রথম সুযোগেই নমিনি ও টিআইএন তথ্য সঠিকভাবে সিস্টেমে যুক্ত হয়েছে কি না যাচাই করুন।

আপনি যদি আগে থেকেই একটা নির্দিষ্ট ব্যাংকের কথা ভাবছেন, Dutch-Bangla Bank, BRAC Bank, বা Islami Bank Bangladesh-এর মতো ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গিয়ে তাদের বর্তমান রেট শিট ও প্রোডাক্ট তালিকা সরাসরি দেখে নিতে পারেন। আর ডিপিএস, এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের মধ্যে হিসাব মিলিয়ে দেখতে চাইলে bangladeshsavings.com-এর মতো ক্যালকুলেটর টুল দিয়ে দ্রুত তুলনা করে নেওয়া যায়।

নতুনরা যেসব ভুল করেন

সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো টিআইএন ছাড়াই একাউন্ট চালিয়ে যাওয়া, যার ফলে প্রতি বছর বাড়তি ৫% কর কাটা হতেই থাকে অথচ সমাধান একদিনের কাজ। দ্বিতীয় ভুল, পুরো সঞ্চয় সেভিংস একাউন্টে ফেলে রাখা, অথচ তার একটা অংশ ডিপিএস বা এফডিআরে সরালেই রিটার্ন কয়েক গুণ বাড়ত। তৃতীয় ভুল, ন্যূনতম ব্যালেন্সের শর্ত না জেনে একাউন্ট খোলা, পরে চার্জ কেটে নেওয়া দেখে অবাক হওয়া। চতুর্থ ভুল, নমিনি তথ্য আপডেট না রাখা, যা পরিবারের জন্য ভবিষ্যতে বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। আর পঞ্চম ভুল, একাধিক ব্যাংকে টাকা ছড়িয়ে না রেখে পুরো সঞ্চয় এক জায়গায় জমা রাখা, বিশেষ করে যখন অঙ্কটা বীমা সীমার চেয়ে অনেক বেশি

শেষ কথা

সেভিংস একাউন্টের সুদের হার একটা সংখ্যা মাত্র, পুরো ছবি নয়। ব্যালেন্স স্তর, ট্যাক্স, ন্যূনতম শর্ত, আর আপনার আসল প্রয়োজন, সব মিলিয়েই ঠিক হয় কোন ব্যাংক আপনার জন্য কাজে দেবে। যদি আপনার লক্ষ্য শুধু তারল্য হয়, সেভিংস একাউন্টের বর্তমান কাঠামোই যথেষ্ট। কিন্তু যদি লক্ষ্য রিটার্ন হয়, সেভিংসে টাকা ফেলে না রেখে ডিপিএস, এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের দিকে তাকানোই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। টিআইএন নিয়ে নিন, নমিনি ঠিক রাখুন, আর বড় অঙ্কের টাকা একাধিক জায়গায় ভাগ করে রাখুন, এই তিনটা কাজ যেকোনো ব্যাংকের সুদের হারের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে আপনার আর্থিক নিরাপত্তায়।

বেস্ট সেভিংস একাউন্ট বাংলাদেশ কোন ব্যাংকে বেশি ইন্টারেস্ট

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সেভিংস একাউন্টে সুদ কীভাবে হিসাব হয়?

বেশিরভাগ ব্যাংক দৈনিক ব্যালেন্সের ওপর ভিত্তি করে সুদ হিসাব করে এবং ছয় মাস বা বছরে একবার তা একাউন্টে জমা করে। ব্যালেন্স যত বেশি স্তরে উঠবে, প্রযোজ্য হারও তত বাড়বে।

ব্যাংক সেভিংস একাউন্ট নাকি সঞ্চয়পত্র, কোনটা ভালো?

এটা তুলনাই নয়, দুটো আলাদা কাজের জন্য। সেভিংস একাউন্ট তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের টাকার জন্য, সঞ্চয়পত্র দীর্ঘমেয়াদি রিটার্নের জন্য। ভালো পরিকল্পনায় দুটোই থাকে, একটার বদলে আরেকটা নয়।

টিআইএন না থাকলে কী সমস্যা হয়?

সুদের ওপর কর কাটার হার ১০% থেকে বেড়ে ১৫% হয়ে যায়। টিআইএন নেওয়া সম্পূর্ণ ফ্রি এবং অনলাইনে করা যায়, তাই এই বাড়তি কর এড়ানোর কোনো কারণ নেই।

সর্বনিম্ন কত টাকা দিয়ে সেভিংস একাউন্ট খোলা যায়?

ব্যাংকভেদে ভিন্ন, তবে সাধারণত ৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে থাকে। ছাত্র বা কিছু বিশেষ স্কিমে এই অঙ্ক আরও কম হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা কি সুদের মতোই নিশ্চিত?

না। ইসলামী ব্যাংক মুদারাবা নীতিতে চলে, অর্থাৎ মুনাফা ব্যাংকের প্রকৃত বিনিয়োগ আয়ের ওপর নির্ভর করে, আগে থেকে নির্দিষ্ট নয়। সাময়িক হার বছরে দুইবার দেওয়া হয়, বছর শেষে চূড়ান্ত সমন্বয় হয়।

ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে আমার টাকার কী হবে?

২০২৬ সালের নতুন আইন অনুযায়ী প্রতি আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা সুরক্ষা পাবেন। এর বেশি অঙ্কের নিরাপত্তার জন্য একাধিক ব্যাংকে টাকা ভাগ করে রাখা বিবেচনা করা যেতে পারে।

Related Articles

Back to top button
error: