স্বাস্থ্য টিপস

ডেঙ্গু রোগীর খাবার তালিকা: কী খাবেন, কী খাবেন না

জ্বর কমে গেলেই অনেকে ভাবেন খাওয়াদাওয়া নিয়ে আর ভাবার দরকার নেই। বাস্তবে ডেঙ্গুতে সঠিক খাবার নির্বাচন করাটা ওষুধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। শরীর দ্রুত সেরে ওঠে কি না, সেটা অনেকটাই নির্ভর করে রোগী কী খাচ্ছেন তার ওপর। এই লেখায় ডেঙ্গু রোগীর জন্য কোন খাবার উপকারী, কোনটা এড়িয়ে চলা উচিত, আর কীভাবে ধাপে ধাপে খাবার পরিবর্তন করবেন, সবকিছু বিস্তারিত বলছি।

শুরুতেই বলে রাখি, প্রতিটা রোগীর অবস্থা আলাদা হতে পারে। এখানে দেওয়া তথ্য সাধারণ নির্দেশনা, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প না।

ডেঙ্গুতে খাবার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো দরকার, আর এই ক্ষমতা বাড়াতে সঠিক পুষ্টি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। জ্বরের সময় শরীর প্রচুর শক্তি খরচ করে, ক্ষুধা কমে যায়, আর সঙ্গে থাকে বমি বমি ভাব, ফলে অনেক রোগী ঠিকমতো খেতেই পারেন না। এই অবস্থায় খাবার এমনভাবে বাছাই করা দরকার, যা অল্প পরিমাণে খেলেও শরীরের ক্যালরি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারে।

ডেঙ্গু রোগীর জন্য ধাপে ধাপে খাবার পরিকল্পনা

ডেঙ্গুর তিনটা ধাপ আছে, আর প্রতিটা ধাপে খাবারের ধরনও একটু একটু বদলানো উচিত।

জ্বরের প্রথম ধাপে, যখন জ্বর তীব্র থাকে আর ক্ষুধা কম থাকে, তখন হালকা তরল ও অল্প ক্যালরির খাবার দেওয়াই ভালো। এই সময়ে বেশি খাওয়ানোর চেষ্টা না করে বরং ঘন ঘন অল্প অল্প করে খাওয়ানো ভালো।

শরীর যখন উত্তরণের ধাপে আসে, অর্থাৎ জ্বর কমতে শুরু করে কিন্তু শরীর তখনও দুর্বল থাকে, তখন সহজপাচ্য খাবার শুরু করা যায়। এর মধ্যে পড়ে খিচুড়ি, দই, ভাত, পোরিজ বা ওটস, সেদ্ধ আলু, আর সেদ্ধ শাকসবজি যেমন পেঁপে বা কুমড়ো। পাকা কলা, পাকা পেঁপে, তরমুজের মতো নরম ফলও এই সময় দেওয়া যায়।

রোগী যখন ধীরে ধীরে পুরোপুরি সুস্থতার দিকে যান, তখন তৃতীয় ধাপে স্বাভাবিক সময়ের মতো পূর্ণাঙ্গ পুষ্টিকর খাবারে ফিরে যাওয়া যায়, তবে হঠাৎ ভারী বা মসলাদার খাবারে না গিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফেরা ভালো।

কী খাবেন

বেশি ক্যালরিযুক্ত অথচ হালকা খাবার

শরীরের শক্তির চাহিদা পূরণ করতে এমন খাবার বেছে নিন যা অল্প পরিমাণে খেলেও যথেষ্ট ক্যালরি দেয়। নরম পাতলা মুগ ডালের খিচুড়ি, পুডিং, ফিরনি, পায়েস, দই, মিষ্টি দই, আর মিল্কশেক এই তালিকায় ভালো বিকল্প। এগুলো হজমে চাপ কম ফেলে অথচ শরীরকে দুর্বল হতে দেয় না।

প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার

ডেঙ্গুর সময় শরীরের প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যায়, কারণ শরীরের ক্ষয়পূরণ আর দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য প্রোটিন খুব জরুরি। দুধ, ডিম, মাছ, মুরগি, আর চর্বিহীন লাল মাংস প্রোটিনের ভালো উৎস। প্রতি বেলার খাবারে অন্তত একটা প্রোটিন উৎস রাখার চেষ্টা করুন।

পর্যাপ্ত তরল

ডেঙ্গুতে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে, তাই তরল গ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটা। ২০২২ সালের ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকাতেও রোগীদের পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডাবের পানি এক্ষেত্রে জনপ্রিয় একটা পছন্দ, কারণ এতে প্রচুর খনিজ লবণ থাকে যা শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু ডাবের পানিই একমাত্র উপায় না। স্যুপ, বিশেষ করে হালকা সবজি বা মুরগির স্যুপ, বার্লি পানি, চিড়ার পানি, লবণ-চিনি মিশ্রিত ওআরএস, এসবও তরলের ঘাটতি পূরণে কার্যকর।

ফলমূল

পাকা কলা, পাকা পেঁপে, আর তরমুজ ডেঙ্গু রোগীর জন্য উপযোগী ফল হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এগুলো সহজে হজম হয় আর শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়।

প্লেটলেট বাড়াতে সহায়ক খাবার

ব্রোকলি ভিটামিন কের ভালো একটা উৎস, যা রক্তে প্লেটলেট বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বলা হয়। যদি প্লেটলেট হঠাৎ অনেকটা কমে যায়, তাহলে খাদ্যতালিকায় ব্রোকলি রাখা যেতে পারে, কারণ এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খনিজও প্রচুর থাকে। তবে এটাকে চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতি ভাবা ঠিক না, বরং সহায়ক খাবার হিসেবে দেখা উচিত।

কী খাবেন না

কড়া চা, কফি, আর এনার্জি ড্রিংক

কড়া দুধ-চা, কফি, এবং এনার্জি ড্রিংক শুধু হজমেই সমস্যা করে না, দ্রুত সুস্থ হওয়ার পথেও বাধা তৈরি করে। এসব পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ শরীর থেকে বাড়তি পানি বের করে দেয়, যা পানিশূন্যতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ডেঙ্গুর সময় এই ধরনের পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো।

বাইরের খাবার

বাসায় রান্না করা খাবার খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। বাইরের খাবারে পরিচ্ছন্নতার নিশ্চয়তা থাকে না, আর অসুস্থ শরীরে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি এড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয়

চিনিযুক্ত খাবার এবং পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্য এটা আরও বেশি জরুরি। উচ্চ চিনিযুক্ত খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

তেল-মসলাযুক্ত ভারী খাবার

জ্বরের সময় হজম ক্ষমতা এমনিতেই কমে যায়, তাই তেল-মসলাযুক্ত ভারী খাবার, ভাজাপোড়া, বা অতিরিক্ত মসলাদার তরকারি এড়িয়ে চলা উচিত। এসব খাবার হজমে চাপ ফেলে এবং শরীরকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

কী খাবেন, কী খাবেন না, একনজরে

খাবারের ধরনখাবেনএড়িয়ে চলবেন
তরলডাবের পানি, স্যুপ, ওআরএস, বার্লি পানি, ফলের রসকড়া চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক
প্রোটিনদুধ, ডিম, মাছ, মুরগি, চর্বিহীন লাল মাংসঅতিরিক্ত তেলে ভাজা মাংস
শর্করাখিচুড়ি, ভাত, পোরিজ, টোস্ট করা ব্রাউন ব্রেডভাজাপোড়া, বেশি মসলাযুক্ত খাবার
ফলপাকা কলা, পাকা পেঁপে, তরমুজটক ও অতিরিক্ত এসিডিক ফল, খালি পেটে বেশি
সবজিসেদ্ধ পেঁপে, কুমড়ো, ব্রোকলি, সবুজ মটরকাঁচা বা অপরিষ্কার সবজি
মিষ্টান্নদই, পুডিং, ফিরনি, পায়েসঅতিরিক্ত চিনিযুক্ত মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
উৎসবাসায় রান্না করা খাবারবাইরের বা রাস্তার খাবার

ডাবের পানি নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই ডাবের পানি খেতেই হবে, এমন একটা ধারণা সমাজে খুব প্রচলিত। এই ধারণার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে ডাবের চাহিদাও হঠাৎ বেড়ে যায়, আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে দামও বাড়িয়ে দেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের মতে, ডাবের পানি উপকারী ঠিকই, কারণ এতে প্রচুর খনিজ লবণ থাকে, কিন্তু এটাই একমাত্র উপায় না। স্যুপ, ওআরএস, বার্লি পানি, বা চিড়ার পানির মতো অন্য তরলও একই কাজ করতে পারে। তাই ডাবের পানি না পেলে বা দাম বেশি মনে হলে বিকল্প তরল দিয়েও তরলের ঘাটতি পূরণ করা যায়।

ডায়াবেটিস রোগীর ডেঙ্গু হলে খাবারের বাড়তি সতর্কতা

যাদের ডায়াবেটিস আছে আর তাদের ডেঙ্গুও হয়েছে, তাদের জন্য খাবার নির্বাচন আরেকটু সতর্কভাবে করা দরকার। মিষ্টি ছাড়া কচি ডাবের পানি, চিনি ছাড়া বা সামান্য স্টিভিয়া দিয়ে বানানো লেবু পানি, লবণ-চিনি মিশ্রিত ডায়াবেটিক ওআরএস, এসব ভালো বিকল্প। খাবারের ক্ষেত্রে ডাল ও চাল দিয়ে বানানো খিচুড়ি, অল্প লবণ ও মসলায় সেদ্ধ ডাল, সেদ্ধ সবজি, টোস্ট করা ব্রাউন ব্রেড, পানি বা অল্প দুধে রান্না করা ওটস, পাতলা করে রান্না করা দুধ সাগু, এগুলো সহজপাচ্য এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক।

ডায়াবেটিস রোগীদের ডেঙ্গু হলে দিনে অন্তত তিন থেকে চারবার ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা দরকার, আর চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা সমন্বয় করতে হবে। রোগীর দ্রুত সুস্থতার জন্য অনেক সময় মুখে খাওয়া ওষুধের বদলে ইনসুলিন ব্যবহার করা হয়।

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু পরামর্শ

একসঙ্গে অনেক পরিমাণে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না। ঘন ঘন অল্প অল্প করে খাওয়ানো সবসময় ভালো ফল দেয়, বিশেষ করে যখন রোগীর ক্ষুধা কম থাকে বা বমি বমি ভাব থাকে।

খাবারের স্বাদ নিয়ে জোর না করে বরং রোগী যা খেতে চান তার মধ্যে থেকেই স্বাস্থ্যকর বিকল্প বের করার চেষ্টা করুন। জ্বরের সময় স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি বদলে যেতে পারে, তাই স্বাভাবিক সময়ে পছন্দের খাবারও এই সময় ভালো না লাগতে পারে।

শিশু রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিন। ছোট বাচ্চারা পানিশূন্যতায় দ্রুত আক্রান্ত হয়, তাই তাদের ঘন ঘন তরল খাওয়ানোর দিকে বাড়তি নজর দিন।

dengue fever bd

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ডেঙ্গু রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার কোনটা?
কোনো একটা নির্দিষ্ট খাবার না, বরং পর্যাপ্ত তরল, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, আর সহজপাচ্য উচ্চ ক্যালরি খাবারের সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্লেটলেট বাড়াতে কোন খাবার খাওয়া উচিত?
ব্রোকলি ভিটামিন কের ভালো উৎস এবং প্লেটলেট বাড়াতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। তবে শুধু কোনো একটা খাবারের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক পুষ্টি ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই ভালো।

ডেঙ্গুতে কি চা-কফি একদমই খাওয়া যাবে না?
কড়া দুধ-চা ও কফি এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এতে থাকা ক্যাফেইন শরীর থেকে পানি বের করে দেয় এবং পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে।

ডাবের পানি না পেলে কী খাওয়াবো?
স্যুপ, ওআরএস, বার্লি পানি, চিড়ার পানি, বা চিনি ছাড়া লেবু পানির মতো বিকল্প তরলও ইলেক্ট্রোলাইট ও পানিশূন্যতার ঘাটতি পূরণে সহায়ক।

ডায়াবেটিস রোগীর ডেঙ্গু হলে খাবারে কী বদলাতে হবে?
চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে, সহজপাচ্য কম শর্করার খাবার বেছে নিতে হবে, আর নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

সহায়ক লিংক

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু কর্নার, সরকারি নির্দেশনার জন্য: https://old.dghs.gov.bd/index.php/bd/

স্বাস্থ্য বাতায়ন হেল্পলাইন, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য, নম্বর ১৬২৬৩

খাবার নির্বাচন করাটা ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে এটা একা কোনো চিকিৎসা না। সঠিক খাবারের পাশাপাশি চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

এই লেখা একটা সংবেদনশীল স্বাস্থ্য বিষয়ে সাধারণ তথ্য দেওয়ার জন্য। রোগীর অবস্থা গুরুতর মনে হলে বা কোনো বিপদজনক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘর পরিষ্কার ও মশা নিয়ন্ত্রণের বাস্তব টিপস

ডেঙ্গু জ্বর লক্ষণ, চিকিৎসা, প্রতিকার, প্রতিরোধ, ও করণীয়

শিশুদের ডেঙ্গু: লক্ষণ, সতর্কতা ও ঘরে করণীয়

জ্বর হলে কখন ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে? (সময় ও রিপোর্ট বোঝা)

চিকুনগুনিয়া: লক্ষণ ও চিকিৎসা (ডেঙ্গুর সাথে পার্থক্য)

ডেঙ্গু প্লেটলেট কত হলে ভয়ংকর?

Related Articles

Back to top button