এক রহস্যময় নারী ও একটি অভিশপ্ত গ্রাম
বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমের এক দূরবর্তী গ্রাম—ধলেশ্বরী। নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট গ্রামটি ছিল শান্ত, সরল আর স্বপ্নময় মানুষের আশ্রয়স্থল। কিন্তু গ্রামটির আরেকটি পরিচয় ছিল—এটি এক রহস্যের গ্রাম। গ্রামের উত্তর প্রান্তে ছিল একটি ছোট, একচালা কুঁড়েঘর। সেই ঘরেই বাস করত এক নারী—নাম কেউ জানত না, বয়স কেউ বুঝত না। তিনি কারো সঙ্গে কথা বলতেন না, কারো বাড়িতে যেতেন না, গ্রামের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতেন না; তবুও গ্রামবাসী তাকে ভুলতে পারত না, কারণ তার উপস্থিতিই ছিল শীতল হাওয়ার মতো, তীক্ষ্ণ আর অস্থির।
নারীটি ছিল অসাধারণ সুন্দরী। তার লম্বা চুল প্রায় কোমর ছাড়িয়ে যেত, চোখ দুটো মনে হত যেন কাঁচের তৈরি—নীলাভ, শীতল, অচেনা। তাকে যারা একবার দেখত, দ্বিতীয়বার তাকাতে সাহস পেত না। তার দৃষ্টি যেন মানুষের বুকের ভিতর ঢুকে মনের ভেতরের অন্ধকারটুকু টেনে বের করে আনত। গ্রামের প্রবীণরা বলত—“ওর দৃষ্টিতে আগুন আছে। অনেক বেশি দেখলে মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।”
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল—তিনি বয়স বাড়াতেন না। গ্রামে যারা দশ বছর আগে তাকে দেখেছে এবং যারা গতকাল দেখেছে—সবাই বলত একই কথা, ‘নারীটি এক বিন্দুও বদলায়নি।’ একই রকম সতেজ, একই রকম যৌবন, একই রকম রহস্যময়।
গ্রামবাসীরা তার ঘরসংলগ্ন পথ ব্যবহার করত না। বর্ষায় নদী ফুলে উঠলেও মানুষ সেই পথ ধরে যেত না। বরং দুই মাইল ঘুরপথ ধরত, তবুও তার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়া এড়িয়ে চলত। মানুষের মাঝে একটাই বিশ্বাস—“ওর ঘরটা শুভ নয়। ওই নারী গ্রামে কোনো অদৃশ্য শক্তি নিয়ে আসে।”
তবুও তিনি কখনো কাউকে ক্ষতি করেছেন এমন প্রমাণ কেউ দেখেনি।
ঠিক যেমন রহস্যময় ছিল তার আসা—তেমনি রহস্যময় ছিল তার চলে যাওয়া।

নারীর অদৃশ্য হওয়া
এক ভোরে গ্রামের রাখাল ছেলেরা খবর ছড়াল—“ওই মহিলা নেই! তার ঘরে কেউ নেই!” দ্রুতই খবর আগুনের মতো ছড়াতে লাগল। গ্রামবাসীরা দল বেঁধে ঘরটিতে গেল। দরজা খোলা, ভেতরে কেউ নেই, শয্যা অগোছালো, কিন্তু কোনো চিহ্ন নেই—তিনি কোথায় গেলেন?
সেই দিন থেকেই যেন ধলেশ্বরী গ্রামের আকাশ বদলে গেল।
প্রথম মাসে ফসল নষ্ট হলো হঠাৎ এক অদ্ভুত কীটের আক্রমণে। দ্বিতীয় মাসে নদীতে পানি কমে গেল। তৃতীয় মাসে বৃষ্টি হলো না এক ফোঁটাও। মানুষ পানির অভাবে তৃষ্ণায় ছটফট করতে লাগল। শিশুদের মুখ শুকিয়ে গেল, মাঠ ফেটে গেল, পশুগুলো মরে পড়তে লাগল একে একে।
গ্রামবাসীরা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে লাগল—তার চলে যাওয়াই কারণ।
এক রাতে গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি মাটির খোকার লাঠিতে ভর দিয়ে বললেন—
“ওর ঘরটা পোড়াতে হবে! ওই অভিশাপ ওখানেই বাঁধা আছে।”
ভয় আর ক্ষুধায় জর্জরিত মানুষজন সেই কথায় রাজি হলো। পরদিন বিকেলে পুরো গ্রাম একত্রিত হয়ে জ্বলন্ত মশাল হাতে দাঁড়াল। কুঁড়েঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আগুন লেলিহান শিখায় ঘরটিকে গ্রাস করতে লাগল। ছাই হয়ে গেল সব।
কিন্তু অভিশাপ গেল না।
বরং বিপদ আরও বাড়ল। বৃষ্টি হলো না তিন মাস। বাজারে খাবারের দাম এত বেড়ে গেল যে কেউ কেনার শক্তি রাখল না। মানুষ গ্রাম ছাড়তে শুরু করল। ধলেশ্বরী ধীরে ধীরে জনহীন হয়ে পড়তে লাগল।
সেই নারীর চিহ্ন ও প্রতিশোধ
একদল সাহসী যুবক সিদ্ধান্ত নিল—ওই নারীকে খুঁজে বের করতেই হবে। তিনি অভিশাপ এনে দিতে পারেন, কিন্তু হয়তো তার হাতেই মুক্তি। কিন্তু যুবকদের দুঃসাহসী যাত্রা ব্যর্থ হলো। তারা বহু দূর পর্যন্ত খুঁজল, বন-জঙ্গল, নদীর ঘাট, পাশের গ্রামের পথ—কোথাও সেই নারী নেই।
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো—যেখানে নারীটি থাকতেন, সেই জায়গায় নতুন এক ঘর তৈরি করতে হবে। হয়তো তাতে অভিশাপ সরে যাবে।
নতুন ঘর হলো। কিন্তু কিছুই বদলালো না।
এক সময় গ্রাম প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে গেল। ঘরগুলোতে তালা, খড়ের মাঠে জনমানবহীন নীরবতা, আর নদীতীরে শুকনো কাদা।
তবে এক সকালে—যেন সবকিছু বদলে গেল।
নদীতে পানি দেখা গেল। আকাশে কালো মেঘ। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল বর্ষণ। গ্রামের লোকেরা যেদিন দীর্ঘ drought–এর মধ্যে প্রথম বৃষ্টি পেল, তারা আনন্দে কেঁদে ফেলল।
কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
বৃষ্টির সময়, গ্রামের প্রান্ত থেকে এক নারীকে দেখা গেল—কোমরে লম্বা চুল বাঁধা, পরনে নীল পাড়ের সাদা শাড়ি, চোখ দুটো আগের মতোই ভৌতিক কাঁচের মতো।
তিনি ফিরে এসেছেন।
ঝড়ের ভেতর দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি ঢুকলেন সেই নতুন ঘরের দিকে—যে ঘরটি তার পুরনো ঘরের জায়গায় তৈরি হয়েছিল। কাঁদছিলেন কিছু গ্রামবাসী, আবার কেউ কেউ আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
তিনি কিছু বললেন না।
কারো দিকে তাকালেনও না।
শুধু ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন।
সেইদিনের পর থেকে গ্রামের ভাগ্য আবার ঘুরে গেল।
ফসলে পোকা নেই, নদী ভরে উঠেছে, শিশুরা সজীব, গবাদি পশু সুস্থ।
গ্রাম আবার প্রাণ ফিরে পেল।
গ্রামবাসীরা আশ্চর্য হয়ে আবার আগের ভয়ের ভিতর ঢুকল।
সবাই বুঝে গেল—এই নারী সাধারণ কেউ নন।
তিনি যেদিন থাকেন, গ্রাম সমৃদ্ধ হয়।
তিনি যেদিন নেই, গ্রাম ধ্বংসের দিকে যায়।
শেষ পর্ব: তার দৃষ্টির অভিশাপ
এক বর্ষাকালে, গ্রামের বিদ্যালয়ের এক ছোট ছেলে কৌতূহলবশত তার বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে চুপচাপ দৃষ্টি দিতে লাগল। ঘরের দরজা হঠাৎ শব্দ করে খুলে গেল। নারীটি দাঁড়িয়ে আছেন, চোখ দুটো ঘুরে তার দিকে তাকাল।
ছেলেটি স্থির হয়ে গেল। যেন শরীরের সব শক্তি কোথায় হারিয়ে গেল। তার চোখের ভেতর চেয়ে রইল সেই নারী—শীতল, হিংস্র, নিস্তব্ধ।
পরদিন সকালে ছেলেটিকে পাওয়া গেল গাছতলায় অচেতন অবস্থায়। জ্ঞান ফিরল, কিন্তু সে কথা বলার ক্ষমতা হারাল। কেউ জিজ্ঞেস করলে শুধু হাত কাঁপত তার।
গ্রামবাসীরা আবার বুঝল—সেই নারীকে কখনো বিরক্ত করা যাবে না।
তিনি যখন ফিরে এসেছেন, গ্রাম আবার বেঁচে উঠেছে—কিন্তু তার উপস্থিতি যে আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ—কেউ জানে না। তিনি দিন-রাত ঘরের ভেতর থাকতেন, মাঝে মাঝে ভৌতিক নীল চোখটি জানালার আড়াল থেকে ঝলসে উঠত।
মানুষ বলে—তার বয়স বাড়ে না, কিন্তু তিনি মানুষের জীবনের সময় কেড়ে নিতে পারেন।
মানুষ বলে—তিনি নিজে বাঁচেন, আর পুরো গ্রামকে বাঁচিয়ে রাখেন।
মানুষ বলে—যদি কেউ তার রহস্য উন্মোচন করতে চায়, তাহলে তার পরিণতি মৃত্যু।
ধলেশ্বরীর ইতিহাস আজও অন্ধকারে ঢাকা।
শুধু একটি কথাই গ্রামের মানুষ এখনও ফিসফিস করে বলে—
“ও নারীটি যখন হাসে, তখন গ্রাম সমৃদ্ধ হয়।
আর যখন সে নীরব থাকে—চারদিকে মৃত্যু নেমে আসে।”
আরও কিছু ভুতের গল্প
রাতের তিনটি কাক- ভয়ংকর সব গা শিউরে উঠা ভৌতিক গল্প- ৭
মধ্য রাতের অতিথিরা- ভয়ংকর সব গা শিউরে উঠা ভৌতিক গল্প- ৬
ভয়ংকর সব গা শিউরে উঠা ভৌতিক গল্প-ভুতের ছোট গল্প ৫
আজব ট্রেন- ভয়ংকর সব গা শিউরে উঠা ভৌতিক গল্প-ভুতের ছোট গল্প ৪
রহস্যে ঘেরা এক ভূতুড়ে কাহিনী-ভুতের ছোট গল্প ৩
ভয়ংকর সব গা শিউরে উঠা ভৌতিক গল্প-ভুতের ছোট গল্প ২
ভয়ংকর সব গা শিউরে উঠা ভৌতিক গল্প-ভুতের ছোট গল্প ১
গল্পটি দীপার। ইউনিভার্সিটির জীবন আর ভালোবাসার লুকোচুরির গল্প
ছায়া ও তার বাবা! সম্পর্ক গুলো কেন এত অদ্ভুত??
শূন্যের এক ভয়ংকর রূপ- গল্পের ভান্ডার ১


